ঢাকা: দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের আর্থিক শৃঙ্খলাকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বিগত কয়েক বছরের ব্যয় সংকোচন নীতি এবারও বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ নতুন অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে একটি জরুরি ও বিশেষ পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী—নতুন গাড়ি কেনা, সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ সফর, নতুন ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন ভবন নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি প্রধান ব্যয়বহুল খাতে অর্থ বরাদ্দ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ স্থগিত অথবা চরমভাবে সীমিত করার আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই পরিপত্রটি জারি করা হয়। পরিপত্রে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সমস্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই নতুন বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞাগুলো অবিলম্বে ও বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে।
পরিপত্রের মূল দর্শন: সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে যে ব্যয় সংকোচন, অগ্রাধিকারহীন খাতগুলোর খরচ কমানো এবং জনগণের ট্যাক্সের পয়সার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার যে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই জরুরি পরিপত্রটি মূলত তারই বাস্তব ও চূড়ান্ত প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বিশাল বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ ও অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারি ব্যয় কমানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: মার্কিন হামলার পর প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের চরম হুঁশিয়ারি, মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের শঙ্কা
এই লক্ষ্যেই পরিপত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা কম খরচে রাষ্ট্রীয় কাজের সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ ও প্রায়োগিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কারণে অপচয় রোধের পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকেরা।
বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে কোপ: নতুন গাড়ি কেনায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
অর্থ বিভাগের নতুন পরিপত্রের সবচেয়ে বড় এবং আলোচিত দিকটি হলো সরকারি অর্থায়নে নতুন যানবাহন ক্রয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ। পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট—উভয় খাতের আওতাতেই নতুন কোনো মোটরযান, জলযান কিংবা আকাশযান কেনার জন্য কোনো সরকারি অর্থ ছাড় করা যাবে না। তবে এই পরিপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জারির পূর্বে যেসব বিশেষ ও অতিব জরুরি প্রকল্পের গাড়ি ক্রয়ের অনুমোদন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ব্যতিক্রম রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
যানবাহন খাতের এই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সরকার একটি পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক শর্ত জুড়ে দিয়েছে। পরিপত্র অনুযায়ী:
- ১০ বছরের বেশি পুরোনো এবং ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়া সরকারি যানবাহনগুলো প্রতিস্থাপনের আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে।
- তবে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন কেনা যানবাহনগুলোকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব 'ফুল ইলেকট্রিক ভেহিকল' (FEV) বা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত গাড়ি হতে হবে।
সরকারের এই কৌশলগত সিদ্ধান্তকে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষার উদ্যোগ, অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদেরা।
নতুন ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে কঠোর কড়াকড়ি
অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বড় ধরণের মূলধনী ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সরকারি অর্থে নতুন কোনো আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্পের ব্যয় সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ মনে করছে, নতুন নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে ইতিমধ্যে শুরু হওয়া প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করা রাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। পরিপত্রের বিশেষ শর্তে বলা হয়েছে, যেসব ভবনের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে ৭০ শতাংশের (৭০%) বেশি সম্পন্ন হয়ে গেছে, কেবল সেই সব চলমান প্রকল্পগুলোই অর্থ বিভাগের বিশেষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে নতুন প্রকল্পের পেছনে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়া থেকে রাষ্ট্র রক্ষা পাবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সামগ্রিক কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ভূমি অধিগ্রহণ খাতে অর্থ বরাদ্দ সম্পূর্ণ বন্ধ
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ ব্যয় হয় জমি কেনা বা ভূমি অধিগ্রহণ খাতের পেছনে। অর্থ বিভাগের নতুন নির্দেশনায় পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে বরাদ্দকৃত সমস্ত অর্থ ব্যয় পুরোপুরি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় থাকা অতি জরুরি কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ ছাড় করার পূর্বে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়া শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাজেট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় অস্বাভাবিক ও কাল্পনিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এই খাতে কৃত্রিম ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা ধরণের অনিয়ম রোধে অধিকতর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা আরোপ করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর ও বিশেষ ঋণ কর্মসূচিতে স্থগিতাদেশ
সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার প্রবণতা দীর্ঘ দিন ধরেই সমালোচিত হয়ে আসছিল। নতুন পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থায়নে এই ধরণের সমস্ত বিদেশ সফরকে কার্যত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন সচল রাখতে একটি বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগী দাতা সংস্থা (যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা) সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে কোনো প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা কার্যক্রমের আয়োজন করে, তবেই কেবল সরকারি কর্মকর্তারা সেখানে অংশ নিতে পারবেন। একই সাথে বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত উচ্চশিক্ষার মাস্টার্স ও পিএইচডি কর্মসূচিগুলো পূর্বের ন্যায় অব্যাহত থাকবে। অর্থ বিভাগের ভাষ্য হলো, দেশের নিজস্ব কোষাগারের অর্থ অপচয় না করে বাহ্যিক ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
আরও পড়ুন: সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় আকস্মিক পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
একই সাথে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সরকার যে বিশেষ সুদযুক্ত ঋণ সুবিধা ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা প্রদান করত, সেই বিশেষ ঋণ কর্মসূচির নতুন বরাদ্দও এই অর্থবছরের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিতকরণ
যেকোনো বড় পণ্য বা যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে পণ্য চালানের পূর্বপরিদর্শন বা প্রিশিপমেন্ট ইনস্পেকশন (PSI) এবং কারখানা গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা বা ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (FAT)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার অজুহাতে কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বিদেশ সফরকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পরিপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এই ধরণের কারিগরি পরীক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং বিশ্বস্ত থার্ড পার্টি সনদপ্রাপ্ত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। এর ফলে বিদেশ ভ্রমণ বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত হবে।
ভ্যালু ফর মানি এবং অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন
পরিপত্রের সমাপনী অংশে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা খরচের বিপরীতে সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য দেশের সকল স্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ধীরগতি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং বাজেট ঘাটতির এই বাস্তব ও কঠিন প্রেক্ষাপটে সরকারের এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অত্যন্ত সময়োপযোগী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খরচ কমানো এবং ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির এই সরকারি প্রচেষ্টা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি প্রদান করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
নিউজ সূত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ এর অফিশিয়াল পরিপত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।