কক্সবাজার: আষাঢ়ের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের অন্যতম পাহাড়ি এবং উপকূলীয় অঞ্চল কক্সবাজারে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলমান এই অবিরাম বৃষ্টির জেরে জেলাটির উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে এক প্রলয়ঙ্কারী পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ি মাটির বিশাল চাপায় একটি স্থানীয় মাদরাসা সম্পূর্ণ মাটির নিচে দেবে গিয়ে অন্তত ৭ জন শিক্ষার্থীর অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো দাবি করেছে। এই আকস্মিক ও প্রলয়ঙ্কারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অসংখ্য কোমলমতি শিশু ও শিক্ষার্থী আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হলেও দুর্ঘটনাস্থলের ভৌগোলিক সংকটের কারণে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৬ সালের ৮ জুলাই, বুধবার দুপুর আনুমানিক সোয়া ১টার দিকে উখিয়া উপজেলার অন্তর্গত কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের এ-০৩ (ব্লক অ-০৩) এলাকায় এই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনার পর পুরো ক্যাম্প এলাকায় এক শোকার্ত ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানহারা মা-বাবার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে কুতুপালংয়ের আকাশ-বাতাস।
দুর্ঘটনার নেপথ্য কাহিনী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ
কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের প্রত্যক্ষদর্শী এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ব্লক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে অবিরাম এবং রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। পাহাড়ি ঢল এবং একটানা বৃষ্টির কারণে কুতুপালং এলাকার পাহাড়গুলোর বেলেমাটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে অত্যন্ত নরম ও আলগা হয়ে পড়েছিল। বুধবার দুপুরে যখন বৃষ্টি কিছুটা মুষলধারে রূপ নেয়, ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ প্রকাণ্ড শব্দে ধসে পড়ে। ধসে পড়া এই লাখো টন কাদা ও মাটির স্তূপ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি অস্থায়ী মাদরাসা ভবনের ওপর তীব্র গতিতে আছড়ে পড়ে।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাহাড়ধসের ঠিক ওই মুহূর্তটিতে মাদরাসার ভেতরে বহু সংখ্যক রোহিঙ্গা শিশু ও শিক্ষার্থী প্রাত্যহিক পাঠ গ্রহণে ব্যস্ত ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় মাদরাসার ভেতর থেকে কারোরই বের হওয়ার বা আত্মরক্ষা করার মতো ন্যূনতম সুযোগ ছিল না। চোখের পলকে পুরো বাঁশ ও টিনের তৈরি মাদরাসা কাঠামোটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা জীবন্ত কবরস্থ হয়।
উদ্ধার অভিযান ও প্রাণহানির ভিন্ন চিত্র: প্রশাসন বনাম মাঠপর্যায়ের তথ্য
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরপরই ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গা বাসিন্দা ও পার্শ্ববর্তী ব্লকের স্বেচ্ছাসেবকরা কোদাল, ঝুড়ি এবং যার যা আছে তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। তারা স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা ভলান্টিয়ারদের সাথে যৌথভাবে আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাটি সরানোর কাজ শুরু করেন। তবে মাটির গভীরতা এবং কাদার ঘনত্বের কারণে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে উদ্ধারকর্মীদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
বিকেল পৌনে ৩টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে কুতুপালং ক্যাম্পের অন্যতম প্রধান রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক রফিক টেলিফোনে এক হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন:
"আমরা স্থানীয় মানুষ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় এ পর্যন্ত অত্যন্ত নিথর ও রক্তাক্ত অবস্থায় ৭ জন শিক্ষার্থীর মরদেহ মাটির নিচ থেকে বের করে এনেছি। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা এখানেই শেষ নয়। মাদরাসার হাজিরা খাতা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের হিসাব অনুযায়ী, এখনো অনেক শিশু মাটির নিচে আটকা পড়ে আছে। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ শিশুদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ততটাই ক্ষীণ হয়ে আসছে।"
অন্যদিকে, উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার দুপুরের দিকে প্রাথমিকভাবে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধারের দাপ্তরিক তথ্য গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানান, প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ দুটি টিম সেখানে কাজ করছে। উপজেলা প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য রওনা হয়েছে। তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং রোহিঙ্গা মাঝিদের দাবি, মাটির নিচ থেকে ইতিমধ্যে ৭টি মরদেহ পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ও চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা কোনোভাবেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ধস: পরিবেশগত সংকট ও স্থায়ী ঝুঁকি
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে মানবিক কারণে লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর বনভূমি ও পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছিল। বন উজাড় এবং নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে এই অঞ্চলের পাহাড়গুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। গাছপালার শিকড় না থাকায় বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ার প্রবণতা বিগত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে যেভাবে প্লাস্টিক, বাঁশ ও টিন দিয়ে হাজার হাজার খুপড়ি ঘর এবং মাদরাসা-মসজিদের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, তা এই ধরণের বড় দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবেশবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরেই এই কৃত্রিম উপায়ে তৈরি পাহাড়গুলোর পাদদেশ থেকে আশ্রিত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু স্থানাভাব এবং ক্যাম্পের ঘনবসতির কারণে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে এই ধরণের মর্মান্তিক প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও টেকসই পুনর্বাসনের দাবি
কুতুপালংয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলেও নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা (ইউএনএইচসিআর, আইওএম) এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার পর গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর আবাসন ব্যবস্থা দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে এখন বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে, যার সরাসরি শিকার হচ্ছে এই অরক্ষিত শরণার্থীরা। এই ধরণের দুর্যোগ থেকে কোমলমতি শিশুদের রক্ষা করতে হলে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালগুলো সংস্কার করা এবং মাদরাসার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ ও সমতল ভূমিতে স্থানান্তর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি
কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের দুর্ঘটনাস্থলে এখনো ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ উদ্ধার অভিযান সমানতালে চলছে। ভারী বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে। নিখোঁজ শিশুদের স্বজনেরা মাদরাসার চারপাশ জুড়ে ভিড় করে আছেন এবং অলৌকিক কোনো আশায় কাদার স্তূপের দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন করছেন। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় এবং ধ্বংসস্তূপের বিশালতার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ধারণা করছেন যে, চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
নিউজ সূত্র: উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ও কুতুপালং ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।