শাহজাদপুর: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার এক বীর সন্তান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সম্মুখ সমরের নির্ভীক সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনছার আর আমাদের মাঝে নেই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে চলা এই গুণী মানুষটি চিরতরে চোখ বুজেছেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে শাহজাদপুরের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, বরং স্থানীয় সমাজ সংস্কার ও নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক জীবন্ত বাতিঘর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
আজ বৃহস্পতিবার দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ সম্মানের সাথে চিরবিদায় জানানো হয়েছে। তাঁর শেষ ইচ্ছা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়।
বগুড়া জিয়া মেডিকেলে চিকিৎসারত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনছার বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (SZMC) ভর্তি করা হয়। সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। তবে সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) মাঝরাতে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আরও পড়ুন: উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ৭ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, বহু শিশু নিখোঁজ
মাঝরাতে তাঁর মৃত্যুর খবর শাহজাদপুরের হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নস্থ দরগারচর গ্রামে পৌঁছালে পুরো গ্রাম জুড়ে এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাতেই মরহুমের নিথর দেহ বগুড়া থেকে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি দরগারচর গ্রামের নিজ বাসভবনে নিয়ে আসা হয়। প্রবীণ এই মুক্তিযোদ্ধাকে শেষ নজর দেখতে গভীর রাতেই তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা, আত্মীয়-স্বজন ও অগণিত গুণগ্রাহী।
দরগারচর ঈদগাহ মাঠে জানাজা ও ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ১০টায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী দরগারচর ঈদগাহ মাঠে মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনছারের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা উপলক্ষে সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ ঈদগাহ মাঠে সমবেত হতে শুরু করেন।
নামাজে জানাজা শুরু হওয়ার পূর্বে দেশের এই বীর শ্রেষ্ঠ সন্তানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদানের জন্য এক বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয়। শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরহুমের কফিনে জাতীয় পতাকা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শাহজাদপুর থানা পুলিশের একটি সুসজ্জিত চৌকস দল।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মরহুমের প্রতি সম্মান জানিয়ে সশস্ত্র ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। পুলিশের চৌকস দলটির বিউগলের করুণ সুরে পুরো ঈদগাহ ময়দানে এক আবেগঘন ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সকলেই দাঁড়িয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজার নামাজ সম্পন্ন করা হয়।
হযরত শাহ হাবিবুল্লাহ শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ) মাজার প্রাঙ্গণে দাফন
নামাজে জানাজা শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনছারের কফিনটি অত্যন্ত আদর ও শ্রদ্ধার সাথে কাঁধে তুলে নেন তাঁর সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধারা। এরপর দরগারচর গ্রামের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হযরত শাহ হাবিবুল্লাহ শহীদ ইয়ামেনী (রহঃ)-এঁর পবিত্র মাজার শরীফ (যা স্থানীয়ভাবে বাদলবাড়ী নামে পরিচিত) সংলগ্ন কেন্দ্রীয় কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মরহুমের লাশ চিরতরে মাটির নিচে দাফন করা হয়। দাফন শেষে মরহুমের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর রুহের মাগফিরাত এবং জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মোনাজাতে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ ও প্রয়াত সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।
বীরের জীবন আলেখ্য ও শোকসন্তপ্ত পরিবার
ব্যক্তিগত জীবনে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনছার ছিলেন একজন অত্যন্ত সৎ, বিনয়ী, পরোপকারী এবং দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব। তিনি শাহজাদপুরের হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের দরগারচর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রামানিক পরিবারের সন্তান। তিনি অত্র গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক মৃত শমসের আলী প্রামানিকের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এদেশের আপামর জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তরুণ আনোয়ার হোসেন আনছার নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন। ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের বিভিন্ন সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।
মৃত্যুকালে তিনি তাঁর স্মৃতি ও আদর্শের উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে গেছেন:
- তাঁর সহধর্মিনী (স্ত্রী), যিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর পাশে ছিলেন।
- তিন জন সুযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত পুত্র।
- এক জন সদ্বীপা কন্যা।
- সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে থাকা বহু গুণগ্রাহী ও সহযোদ্ধা।
তাঁর এই চলে যাওয়া কেবল তাঁর পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র শাহজাদপুর তথা সিরাজগঞ্জ জেলার মুক্তিযোদ্ধা সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
শাহজাদপুরে শোকের ছায়া ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের শোক প্রকাশ
প্রবীণ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার আকস্মিক প্রয়াণে শাহজাদপুরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
আরও পড়ুন: সলঙ্গায় ভাড়া বাসায় গোপন আস্তানা: সংঘবদ্ধ নারী ছিনতাইকারী চক্রের ১১ সদস্য গ্রেপ্তার
শোকবার্তায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, আনোয়ার হোসেন আনছার ছিলেন আমাদের যুদ্ধদিনের এক অকুতোভয় সহযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর তিনি যেভাবে শান্তিকামী সমাজ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও অভিভাবককে হারালাম। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও সাবরিনা শারমিন মরহুমের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা মরহুমের আত্মার শান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে আন্তরিক দোয়া প্রার্থনা করেছেন।
নিউজ সূত্র: শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন ও দরগারচর গ্রামবাসী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।