মার্কিন হামলার পর প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের চরম হুঁশিয়ারি, মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের শঙ্কা

মার্কিন হামলার পর প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের চরম হুঁশিয়ারি, মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
 আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার যোগ হয়েছে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আকস্মিক সামরিক হামলার পর বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনের এই সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও কঠোর নিন্দা প্রকাশ করে তেহরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের নীতি-নির্ধারকদের দাবি, মার্কিন এই আগ্রাসন কেবল তাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং অঞ্চলটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য অতীতে স্বাক্ষরিত যুদ্ধ অবসান-সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির একটি গুরুতর এবং ক্ষমার অযোগ্য লঙ্ঘন। এই হামলার পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশ্যে এক নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বড় ধরণের আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

​২০২৬ সালের ৮ জুলাই, বুধবার ভোরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই বিবৃতিতে ইরান পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনকানুন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিমালার ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ৪ নম্বর দফা সরাসরি লঙ্ঘন করে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত একাধিক কৌশলগত পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি কেন্দ্রে এই নগ্ন হামলা চালিয়েছে।

​আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মার্কিন আগ্রাসনের বিবরণ

​ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আকস্মিক হামলাটি ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের আত্মরক্ষা এবং নজরদারি ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, সেগুলো মূলত পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক নৌসীমানায় চোরাচালান রোধ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত ছিল।

আরও পড়ুন: মালচিং পদ্ধতিতে অসময়ের তরমুজ চাষ: পাকুন্দিয়ার কৃষকদের নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লব

​বিবৃতিতে ইরান অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি অঞ্চলটিতে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ অবসান-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফার একটি স্পষ্ট ও নগ্ন লঙ্ঘন। ওই চুক্তির প্রথম দফায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ ছিল যে, কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে না এবং সমস্ত ধরণের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও উস্কানিমূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।

​প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইরানের নজিরবিহীন আল্টিমেটাম

​এবারের বিবৃতিতে ইরানের সবচেয়ে কঠোর ও কৌশলগত অবস্থানটি দেখা গেছে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি। তেহরান আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন ধারা ও নীতিমালার দিকে ইঙ্গিত করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিশ্বের প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি বড় ধরণের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। আর সেই দায়িত্বটি হলো—তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড, আকাশসীমা, জলসীমা কিংবা সেখানে অবস্থিত কোনো সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি ব্যবহার করে যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো আগ্রাসী শক্তি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো ধরণের হামলা বা বৈরী অভিযান পরিচালনা করতে না পারে।

​উপসাগরীয় দেশগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান তার বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে:

  • ​ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যেকোনো মার্কিন বা বিদেশী সামরিক হামলায় যদি কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজেদের ভূমি বা লজিস্টিকস ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবে সেই আচরণকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী 'আগ্রাসনের অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণ ও সহায়তা' (Complicity in Aggression) হিসেবে গণ্য করা হবে।
  • ​এ ধরণের সহযোগিতাকারী দেশকে ইরান আর বন্ধু বা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করবে না, বরং তাদেরকেও মার্কিন আগ্রাসনের সমান অংশীদার এবং ইরানের শত্রু পক্ষ হিসেবে গণ্য করা হবে।

​বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই হুঁশিয়ারি মূলত কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর প্রতি একটি পরোক্ষ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সামরিক ঘাঁটি ও নৌবহর অবস্থান করছে।

​জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

​মার্কিন এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান। বিবৃতিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। ইরান বলেছে, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করার যে প্রাথমিক দায়িত্ব জাতিসংঘের ওপর অর্পণ করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পালনে সংস্থাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের এই নীরবতা বিশ্বকে আরও বেশি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেহরান অবিলম্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে এই মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার এবং ওয়াশিংটনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে।

​অনুচ্ছেদ ৫১ এবং ইরানের আত্মরক্ষার বজ্রকঠিন অধিকার

​বিবৃতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত অংশে ইরান তাদের সামরিক ও কৌশলগত প্রতিরোধের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা এত দিন ধৈর্য ধারণ করলেও নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা বিন্দুমাত্র আপস করবে না। জাতিসংঘ সনদের বিখ্যাত ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের (Article 51) কথা উল্লেখ করে ইরান বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই ধারা অনুযায়ী যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষা করার জন্য 'বৈধ আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার' (Inherent Right of Self-Defense) রয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: কোণঠাসা পশ্চিমা বিশ্ব

​ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের দেওয়া এই আইনি অধিকার প্রয়োগ করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী (ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী) দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সামগ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে যেকোনো ধরণের প্রয়োজনীয় ও কঠোরতম সামরিক পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করবে না। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, আগামীতে এ ধরণের কোনো দুঃসাহস দেখানো হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাহিনী কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকবে না, বরং তারা সরাসরি হামলার মূল উৎস, দায়ী পক্ষ এবং সহযোগিতাকারী ঘাঁটিকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে গুঁড়িয়ে দেবে।

​ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কালো মেঘ

​ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিবৃতির পর পারস্য উপসাগর এবং বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' অঞ্চলে এক ধরণের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই উত্তেজনা একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয় এবং ইরান যদি তার হুঁশিয়ারি অনুযায়ী প্রতিবেশী দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে, তবে সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও বড় ধরণের মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।

​সব মিলিয়ে, ইরানের এই কঠোর ও আপসহীন বার্তা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন। প্রতিবেশী দেশগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে কি না, কিংবা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই সংকটে কী ভূমিকা পালন করে—তার ওপরই নির্ভর করছে চব্বিশের এই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থায়িত্ব।

নিউজ সূত্র: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল প্রেস উইং ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন