​ভারতে ছাত্র আন্দোলনে রাহুল গান্ধী আটক, মোদি সরকারের কাছে ৫ দফা দাবি!

​ভারতে ছাত্র আন্দোলনে রাহুল গান্ধী আটক, মোদি সরকারের কাছে ৫ দফা দাবি!
ছবি: সংগৃহীত

 প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ২২ জুলাই ২০২৬:
প্রতিবেশ দেশ ভারতে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিরোধীদের রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা অতিক্রম করেছে। ভারতের তরুণ প্রজন্মের 'জেন-জি' (Gen-Z) শিক্ষার্থীদের চলমান গণদাবি ও রাজপথের উত্তাপের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় দেশটির প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে সাময়িকভাবে আটক করে দিল্লি পুলিশ। পরবর্তীতে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) গভীর রাতের দিকে তাঁদেরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও রাজনৈতিক জলঘোলা থামেনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন এক জরুরি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা বর্ষণ করেন রাহুল গান্ধী। দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গলদ দূরীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে সুনির্দিষ্ট ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেন।

আরও পড়ুন: পাবনার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রাসেলসহ ২ জন গ্রেপ্তার!

রাহুল গান্ধীর ঘোষিত ৫ দফা মূল দাবিসমূহ

শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি না করে তাঁদের যৌক্তিক সংবেদনশীল দাবিগুলো অনতিবিলম্বে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে রাহুল গান্ধী যে পাঁচ দফা শর্ত প্রদান করেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১. কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ মন্ত্রীর পদত্যাগ: প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলার দায় কাঁধে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ দাবি করা হয়।
  • ২. মামলা প্রত্যাহার ও আইনি ব্যবস্থা: আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অযাচিত ও নৃশংস হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নামে করা সমস্ত বানোয়াট মামলা অবিলম্বে তুলে নিতে হবে।
  • ৩. প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা: গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজপথে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অভিযানের নির্দেশের দায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জনসমক্ষে প্রকাশ্যে ক্ষণ প্রার্থনা করতে হবে।
  • ৪. সংসদে জরুরি আলোচনা: শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা দেওয়া অস্থিরতা নিয়ে জাতীয় সংসদে জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ দিতে হবে।
  • ৫. শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক সংস্কার: নিট সহ অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবং দুর্নীতির রাশ টানতে দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

উত্তাল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকা ও কংগ্রেস নেতাদের আটক প্রক্রিয়া

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন সংলগ্ন অতি-সংবেদনশীল লোক কল্যাণ মার্গ এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি সংহতি প্রকাশ করে আন্দোলনে যোগ দেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা এবং দলটির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক।

বিক্ষোভের চরম পর্যায়ে দিল্লি পুলিশ ঘেরাও সৃষ্টি করে নেতাদের জোরপূর্বক আটক করে। আটক করার পর রাহুল গান্ধীকে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লির বিখ্যাত ছত্রশাল স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে স্থাপিত অস্থায়ী শিবিরে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে রাখা হয় মন্দির মার্গ থানায়। ঘটনাটি ভারতের রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য সোনিয়া গান্ধী নিজে থাবায় উপস্থিত হয়ে কন্যা প্রিয়াঙ্কার খোঁজখবর নেন। অবশেষে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে গভীর রাতে পুলিশ আটক সকল নেতাদের মুক্ত করে দিতে বাধ্য হয়।

শিক্ষা খাতের দুর্নীতি নিয়ে চরম প্রশ্নবাণ

আটক অবস্থা থেকে রাজপথে ফিরে ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ভিডিও বার্তায় ভারতের সাম্প্রতিক বিতর্কিত মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা উল্লেখ করে সরকার প্রধানকে চরম কোণঠাসা করেন রাহুল গান্ধী। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার তরুণের স্বপ্নকে পদে পদে হত্যা করছে।

আরও পড়ুন: রণক্ষেত্র ভারতের দিল্লি, বন্ধ ইন্টারনেট: পদযাত্রায় তুমুল সংঘাত!

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাকাঠামোর পচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীদলীয় এই নেতা স্পষ্ট ভাষায় বলেন:

"ভারতের প্রাচীন ও গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষাব্যবস্থা কেন প্রতিনিয়ত ধসে পড়ছে? কেন প্রতিটি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে? শিক্ষা ব্যবস্থা কেন দেশে সাধারণ মানুষের কাছে এতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে? সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদে কোটি কোটি পরিবার কেন আর্থিক দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হচ্ছে? এগুলো অত্যন্ত প্রামাণিক ও মৌলিক প্রশ্ন, আর এসব প্রশ্ন তোলার জন্য সরকার কাউকেই থামিয়ে রাখতে পারবে না।"

শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার

শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে স্যালুট জানিয়ে কংগ্রেসের এই শীর্ষনেতা আরও যুক্ত করেন, "তরুণরা ভারতের ভবিষ্যৎ। তাঁদের সততা, সাহস ও ন্যায়ের লড়াইয়ের পাশে কংগ্রেস সর্বদা রাজপথে থাকবে। দেশের স্বার্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো অপরাধ হতে পারে না।"

ভারতের এই অভূতপূর্ব শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন কেবল ছাত্রসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মোদি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শিক্ষাব্যবস্থার এই সঙ্কট দ্রুত নিরসন করা না হলে পুরো ভারতে এই দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।


সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা (এএফপি, পিটিআই) ও বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক বার্তা।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন