আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ২২ জুলাই ২০২৬:
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের অনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অভূতপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। বুধবার (২২ জুলাই) সকাল থেকে রাজপথের এই অনশনমঞ্চে শিক্ষার্থী, সচেতন তরুণ সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজপথের পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে—ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তাত্ক্ষণিক পদত্যাগ নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও আমূল সংস্কার আনা। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ ও খ্যাতনামা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল বেড থেকেই অনশন অব্যাহত রেখেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাঁদের ন্যায্য দাবিসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা রাজপথ ছাড়বেন না।
বৈশ্বিক রূপ নিল ভারতের ছাত্র আন্দোলন
ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে এই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের রেশ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়াতে শুরু করেছে। আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিশ্বের একাধিক দেশের বড় বড় শহরে প্রবাসী ভারতীয় ও মানবাধিকার কর্মীরা রাজপথে নেমেছেন:
- যুক্তরাষ্ট্র: নিউইয়র্ক শহর ও প্রযুক্তিনগরী সান হোসেতে বৃহৎ সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
- যুক্তরাজ্য: লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে প্রবাসী ভারতীয়দের আয়োজনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
- আয়ারল্যান্ড: রাজধানী ডাবলিনে প্রবাসীরা জমায়েত হয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হন।
দিল্লির উত্তপ্ত রাজনীতি ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ ও পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে চরম উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার সময় বিরোধী দলীয় প্রধান নেতা রাহুল গান্ধীকে আটক করা হয়। আটক অবস্থায় তিনি সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন, যার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি অন্যতম।
একই সাথে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভাতেও বিষয়টি নিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান সচেতক নাদিমুল হক ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের বর্বরোচিত ভূমিকার ওপর জরুরি আলোচনার দাবি জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ প্রদান করেছেন। এর আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথের এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
তৃণমূলের আলোচিত সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র নিজে যন্তর মন্তরে গিয়ে সরাসরি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি ক্ষমতাসীন সরকারকে কটাক্ষ করে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েও এই অনশন ভাঙা সম্ভব হয়নি। আন্দোলনটি এখন বর্তমান সরকারের জন্য 'পাঠ্যসূচির বাইরের সিলেবাস' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কণ্ঠরোধের অভিযোগ ও বাকস্বাধীনতার বিতর্ক
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ও সমন্বয়ক সৌরভ দাস অভিযোগ তুলেছেন যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বার্তা আদান-প্রদান সংক্রান্ত হিসাব (অ্যাকাউন্ট) সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাময়িকভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে কি তরুণ সমাজের ন্যায়ের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা সম্ভব?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিছক শিক্ষাসংক্রান্ত ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক আন্দোলনটি এখন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় রূপ নিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক জবাবদিহিতার আন্দোলনটি এখন মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ইতিবাচক সমাধান না আসায় রাজপথের উত্তাপ দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় জাতীয় সংবাদ মাধ্যম (পিটিআই, এনডিটিভি) এবং সামাজিক যোগাযোগ বার্তা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।