মরার আগে একটা ঘর ও ৩ বেলা খাবার চান বকশীগঞ্জের ৯৫ বছরের বৃদ্ধ!

মরার আগে একটা ঘর ও ৩ বেলা খাবার চান বকশীগঞ্জের ৯৫ বছরের বৃদ্ধ!
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বিশেষ জেলা প্রতিনিধি, বকশীগঞ্জ (জামালপুর):
"ভালো কিছুর আশায় দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বুকে আগলে ধরে রাখছি। এনআইডি ছাড়া তো আমাদের আর কিছুই নেই। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মরার আগে যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই আর তিন বেলা ডাল-ভাতের ব্যবস্থা হতো, তবে মরেও শান্তি পাইতাম। এমনকি আমার মৃত্যুর পর কাফনের কাপড় কেনার মতো সম্বলটুকুও নেই।"—ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে আকুল কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ৯৫ বছর বয়সী চরম অসহায় ও দৃষ্টি-শ্রবণপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধ কবির উদ্দিন।

সামাজিক নিরাপত্তা ও নানা সরকারি প্রকল্পের জোয়ার বইলেও জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর শহরের একদম কেন্দ্রীয় এলাকা মিয়াপাড়ার এক স্যাঁতসেঁতে ডোবার কোণে অত্যন্ত অমানবিক ও বীভৎস পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন ৯৫ বছরের কবির উদ্দিন ও তাঁর ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা স্ত্রী নূর জাহান বেগম। দীর্ঘ সাতটি দশক ধরে একখণ্ড নিজস্ব ভূমির অভাবে অন্যের জায়গায় তোলা ভাঙা এক ঝুপড়ি ঘরে দিনপাত করছেন এই ভূমিহীন দম্পতি। বার্ধক্যের করাল গ্রাসে তাঁদের শরীর এখন অচল, অনাহারে-অর্ধাহারে শরীর শুকিয়ে পিঠ যেন পেটের সঙ্গে মিশে গেছে।

আরও পড়ুন: দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন তুঙ্গে, বিশ্বজুড়ে প্রবাসীদের সংহতি সমাবেশ!

দুর্গন্ধময় পরিবেশ ও করুণ জীবন বাস্তবতা

সরেজমিনে বকশীগঞ্জের মিয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নর্দমার আবর্জনা ও পচা দুর্গন্ধযুক্ত ডোবার পাশে কয়েকটি জরাজীর্ণ পুরনো টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট একটি ছাপড়া। সেখানে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই খাবার পানি কিংবা শৌচাগারের ন্যূনতম আধুনিক কোনো সুযোগ-সুবিধা। বৃষ্টির দিনে ফুটো টিন দিয়ে অনবরত পানি পড়ে ঘরের ভেতরটা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। মশা-মাছি, পোকামাকড় এবং বিষাক্ত সাপের উপদ্রবের মধ্যেই মৃত্যুর প্রহর গুনছেন এই প্রবীণ দম্পতি।

কবির উদ্দিন পুরোপুরি চোখে দেখেন না এবং কানেও শোনেন না। স্ত্রীর সাহায্য ছাড়া তিনি একচুল নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারেন না। অন্যদিকে জীবনের পুরোটা সময় অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করা স্ত্রী নূর জাহান বেগমও এখন বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। ভিক্ষা করার মতো শারীরিক সামর্থ্যটুকুও আজ হারিয়ে গেছে এই পরিবারের।

সরকারি সহায়তার করুণ চিত্র ও ক্ষোভ

একমাত্র কন্যাসন্তানকে বিয়ে দিলেও তাঁর শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন হওয়ায় বাবা-মাকে সাহায্য করার মতো কোনো সামর্থ্য তাঁদের নেই। অথচ এই বিশাল আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সুফল আজও এই নিভৃত পরিবারটির দুয়ারে পৌঁছায়নি।

এই দম্পতির দুঃখ-কষ্টের কিছু প্রধান দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ভাতার বৈষম্য: দুটি মানুষই শতভাগ বয়স্ক ও অচল হলেও মাত্র একজনের নামে মেলে বয়স্ক ভাতার নগণ্য অর্থ, যা দিয়ে ওষুধ কেনাও সম্ভব হয় না।
  • ত্রাণ ও সহায়তাহীনতা: ঈদ কিংবা বিশেষ সামাজিক উৎসবে হাজারও ত্রাণের কার্ড বিতরণ করা হলেও এই অভুক্ত দম্পতির কপালে জোটে না একটি স্লিপও।
  • কাফনের কাপড়ের অভাব: অর্থাভাবে নিত্যদিনের আহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে মৃত্যুর পর কাফনের কাপড়ের জন্য স্রষ্টার ওপর ভরসা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই।

স্থানীয়দের বক্তব্য ও মানবিক আকুতি

সুদীর্ঘ ৭০ বছর ধরে নিজের জমিতে আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা লিটন সিদ্দিকী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "কয়েকটি জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়া ছাড়া এই মানুষগুলোর আর কোনো কিছুই নেই। আমাদের জায়গায় বহু বছর ধরে আছেন। সরকারি বা বেসরকারিভাবে একটি স্থায়ী ঘর ও খাবারের ন্যূনতম ব্যবস্থা করা হলে নিঃশ্বেষ হতে যাওয়া দুটি জীবনের খুব বড় উপকার হতো।"

আরও পড়ুন: অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস

এলাকার সাবেক প্রধান শিক্ষক মাসুমুল হক সিদ্দিকী জানান, "প্রতিটি বর্ষায় তাঁদের ঘরটি বসবাসের একদম অযোগ্য হয়ে পড়ে। চারপাশে নর্দমা ও মশার স্তূপ থাকায় ভীষণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন তাঁরা। সমাজের বিত্তবান ও সরকারের অবিলম্বে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।"

প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি

দুর্ভোগের বিষটি নিয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আসমা উল হুসনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ইতিপূর্বে কোনো স্থানীয় প্রতিনিধি বা ব্যক্তি অফিশিয়ালি প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তবে এখন বিষয়টি জানতে পেরে পৌরসভার পক্ষ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী জরুরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও সমাজের দানশীল ব্যক্তিদের একটু সহানুভূতিই পারে জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে এসে জরাজীর্ণ ডোবার কোণ থেকে দুটি অসহায় মানুষকে মুক্ত করে মানবিক জীবন উপহার দিতে।


সংবাদ সূত্র: বকশীগঞ্জ স্থানীয় প্রতিনিধি ও ভূক্তভোগী পরিবারের সরাসরি সাক্ষাত্কার।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন