খেলাধুলা ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: ফুটবল বিশ্ব এখন মেতে আছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বা ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায়। সবুজ মাঠের সবুজ ঘাসে বুটের জাদু, নিখুঁত পাস আর অবিশ্বাস্য সব গোল করে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মন জয় করে নিচ্ছেন বিশ্বের অন্যতম সর্বকালের সেরা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে পর্তুগিজ এই মহাতারকা কেবল মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মাঠের বাইরেও যে তিনি একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ, তার প্রমাণ তিনি ক্যারিয়ারজুড়ে অসংখ্যবার দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ফুটবলের এই মহা-যজ্ঞের ব্যস্ততার মাঝেই মাঠের বাইরের এক অভূতপূর্ব মানবিকতার নজির গড়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন সিআরসেভেন (CR7)। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে একটি পা হারানো এক ছোট্ট নিষ্পাপ ফুটবল ভক্তের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে আবারও প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন এই পর্তুগিজ অধিনায়ক।
আরও পড়ুন: গৃহিণী থেকে সাফল্যের চূড়ায় রায়পুরের রোকসানা: গ্রামীণ নারী জাগরণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত
ভেনিজুয়েলার প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও এক কিশোরের ট্র্যাজেডি
কিছুদিন আগে লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানে পর পর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প। এই জোড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধূলিসাৎ হয়ে যায়, প্রাণ হারান বহু মানুষ এবং হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নিষ্ঠুর শিকার হয়েছে ভেনিজুয়েলার লা গুয়াইরা (La Guaira) অঙ্গরাজ্যের এক অত্যন্ত প্রতিভাবান ও ফুটবলপ্রেমী কিশোর আন্দ্রেস মিয়েলেস। ভূমিকম্পের সেই নারকীয় মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হয় আন্দ্রেস। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা তার জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে তার একটি পা কেটে অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হন। একটি পা হারিয়ে বর্তমানে লা গুয়াইরার একটি স্থানীয় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে এই ছোট্ট শিশুটি। যেখানে তার সমবয়সী অন্য শিশুরা মাঠে ফুটবল খেলে সময় পার করার কথা, সেখানে আন্দ্রেসকে এখন হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে।
যন্ত্রণার মাঝেও ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা
শারীরিক এবং মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলেও ফুটবলের প্রতি আন্দ্রেসের নিখাদ ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমে যায়নি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তার সমস্ত মন পড়ে রয়েছে চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের দিকে। আর এই কঠিন সময়ের মধ্যেও তার মনের কোণে লুকিয়ে ছিল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু আবেগঘন একটি ছোট্ট ইচ্ছা। বর্তমান সময়ে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী ছোট-বড় সবার মাঝে অফিশিয়াল স্টিকার অ্যালবাম (World Cup Sticker Album) সংগ্রহের এক বিশাল উন্মাদনা কাজ করে। আন্দ্রেসও তার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে সেই বিশ্বকাপের স্টিকার অ্যালবামটি পূরণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সাধের সেই অ্যালবামে একটি বিশেষ স্টিকারের কমতি ছিল—তা হলো তার জীবনের একমাত্র আদর্শ, প্রিয় ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অফিসিয়াল স্টিকার। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও প্রিয় তারকার এই স্টিকারটি না পাওয়ার বেদনা আন্দ্রেসকে বেশি ভাবিয়ে তুলছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি ও রোনালদোর কাছে বার্তা পৌঁছানো
নিষ্পাপ এই শিশুটির রোনালদোর স্টিকার পাওয়ার তীব্র আকুলতা এবং তার করুণ জীবনযুদ্ধের গল্পটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সাংবাদিক এবং মানবিক কিছু মানুষের কল্যাণে এই হৃদয়স্পর্শী কাহিনীটি শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল শিবিরে থাকা স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কান পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের চরম ব্যস্ততা এবং শতভাগ মনোযোগের মাঝেও সিআরসেভেন এই দুঃখী ভক্তের কথা ভুলে যাননি। আন্দ্রেসের কষ্টের কথা শোনার পর পর্তুগিজ মহাতারকার মন গলে যায়। তিনি কালবিলম্ব না করে তার জাতীয় দল পর্তুগালের অফিশিয়াল জার্সি গায়ে জড়িয়ে সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ভক্ত আন্দ্রেসের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ব্যক্তিগত ভিডিওবার্তা (Personalized Video Message) রেকর্ড করে পাঠান।
ভিডিওবার্তায় রোনালদোর আবেগঘন বার্তা ও ম্যাচের আমন্ত্রণ
রোনালদোর পাঠানো সেই বিশেষ ভিডিওবার্তায় দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত অমায়িক ও স্নেহশীল কণ্ঠে তার এই ছোট্ট ভক্তকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং তার মনস্তাত্ত্বিক শক্তি বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ভিডিওবার্তায় আন্দ্রেসকে উদ্দেশ্য করে রোনালদো বলেন, “হ্যালো আন্দ্রেস, কেমন আছ তুমি? আশা করি ভালো আছ। তোমাকে অনেক দূর থেকে একটি বড় এবং উষ্ণ ডিজিটাল আলিঙ্গন পাঠাতেই মূলত আজ আমি এই ভিডিওটি করছি। আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে তুমি আমার অনেক বড় একজন ভক্ত এবং বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছ। আমি মনে-প্রাণে আশা করি এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি যেন তুমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারো। তোমার এই সাহসিকতাকে আমি স্যালুট জানাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই তুমি আমার যেকোনো একটি লাইভ ম্যাচ গ্যালারিতে বসে সরাসরি উপভোগ করতে এসো। আমরা সেখানে একসঙ্গে খেলা দেখব এবং দারুণ কিছু সময় কাটাব। আমি তোমার সঙ্গে সরাসরি দেখা করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। মনের জোর হারিও না, সবসময় সাহস রেখো, আমার বন্ধু।”
বিশ্বজুড়ে প্রশংসার ঝড় ও স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত
আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ভেনিজুয়েলার প্রখ্যাত সাংবাদিক গ্যাবি আরোচার দেওয়া সর্বশেষ তথ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোনালদোর এই অভূতপূর্ব ভিডিওবার্তাটি পাওয়ার পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা আন্দ্রেসের মুখে যে স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু ভিডিওবার্তাতেই এই পরোপকারী যজ্ঞ শেষ হয়ে যায়নি; রোনালদোর এই মানবিক উদ্যোগের কথা জানতে পেরে বিশ্বের কয়েকজন অত্যন্ত উদার ও দয়ালু দাতা এগিয়ে আসেন। তাদের সম্মিলিত সহায়তায় আন্দ্রেসের সেই বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্টিকারটি সংগ্রহ করে ইতিমধ্যে তার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, পর্তুগাল ফুটবল দলের ক্যাম্প থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিজের হাতে অটোগ্রাফ বা স্বাক্ষর করা একটি বিশেষ অফিশিয়াল জার্সিও খুব শীঘ্রই বিশেষ পার্সেলের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলায় আন্দ্রেসের হাসপাতালের ঠিকানায় উপহার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: খামেনির শেষ বিদায়: ওয়াশিংটনের নজিরবিহীন কূটনৈতিক চাপ ও নতুন বৈশ্বিক সমীকরণ
রোনালদো পরিবারের সামগ্রিক মানবিক ঐতিহ্য
বাস্তবিক অর্থে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর এই ধরণের মহৎ এবং মানবিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটিই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধবিধ্বস্ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত কিংবা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, রোনালদোর এই সুন্দর উদ্যোগের ঠিক কিছুদিন আগেই তার জীবনসঙ্গী ও বিখ্যাত মডেল জর্জিনা রদ্রিগেজ ভেনিজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন হওয়া হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে বিশাল পরিমাণ জরুরি জীবনরক্ষাকারী খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছিলেন। ফলে এটি স্পষ্ট যে, পুরো রোনালদো পরিবারই ভেনিজুয়েলার এই মানবিক সংকটে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
উপসংহার ও টেকসই মানবিক বার্তা
একটি পা হারিয়ে হয়তো কিশোর আন্দ্রেসের ফুটবলার হওয়ার বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা মানুষের এই একটি ছোট্ট ভালোবাসার বার্তা তার মনের ভেতরের বেঁচে থাকার এবং লড়াই করার শক্তিকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো প্রমাণ করেছেন যে, একজন প্রকৃত মহাতারকা বা সুপারস্টার কেবল মাঠের ট্রফি বা গোল সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর ক্ষমতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব। বিশ্বকাপের এই রোমাঞ্চকর আবহের মাঝে রোনালদোর এই 'জান বাজি রাখা' মানবিকতা ক্রীড়া ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এক উজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। আন্দ্রেসের মতো হাজারো শিশু এই ধরণের মানবিক ভালোবাসার স্পর্শে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবে, এটাই ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
নিউজ সূত্র: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদ ও এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল প্রতিবেদন।

দারুণ খরব
উত্তরমুছুনএকটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।