চাঁদপুর লঞ্চঘাটে ৯ কেজি গাঁজাসহ দুই বোনকে গ্রেপ্তার করেছে নৌ-পুলিশ

চাঁদপুর লঞ্চঘাটে ৯ কেজি গাঁজাসহ দুই বোনকে গ্রেপ্তার করেছে নৌ-পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর ও প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক চাঁদপুর জেলার প্রধান লঞ্চঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়মিত কঠোর নজরদারির ফলে একটি বড় ধরনের মাদক পাচারচেষ্টা সফলভাবে পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। দেশের উদীয়মান যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা এবং মাদকের ভয়াল থাবা থেকে জনপদকে মুক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসনের গৃহীত জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে নৌ-পুলিশের একটি চৌকস দল অত্যন্ত সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সাথে এই সফল অভিযান পরিচালনা করে। মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চোরাচালান রোধে যখন দেশজুড়ে কঠোর আইন প্রয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই আকস্মিক ঝটিকা অভিযান মাদক ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের মধ্যে ব্যাপক ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সাধারণ যাত্রীদের ছদ্মবেশে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে নদীপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে যারা অবৈধ মাদকদ্রব্য বহন ও সরবরাহ করে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে এটি একটি অত্যন্ত জোরালো এবং শিক্ষণীয় বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সহায়তায় জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে ঢাকা থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল ফরিদপুর থেকে উদ্ধার

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, গত রবিবার (১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) দুপুরের দিকে চাঁদপুর নৌ-থানার সুযোগ্য ও দায়িত্বশীল ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজমগীর হোসাইনের সরাসরি দিকনির্দেশনা ও সার্বিক নেতৃত্বে নৌ-পুলিশের একটি বিশেষ আভিযানিক দল চাঁদপুর সদর মডেল থানাধীন ব্যস্ততম চাঁদপুর লঞ্চঘাট এলাকার বিআইডব্লিউটিএ-এর পন্টুনের ওপর অবস্থান গ্রহণ করে। এর আগে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও গোপন সূত্রের মাধ্যমে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট সংবাদ পৌঁছায় যে, একটি বিশেষ চক্র সুকৌশলে নদীপথ ব্যবহার করে বড় ধরনের মাদকের চালান অন্যত্রে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে অবস্থান করছে। উক্ত সংবাদের সত্যতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পন্টুনের আশপাশে অবস্থান নেন এবং সন্দেহভাজন দুই নারীকে আটক করে তাদের সাথে থাকা ভারী ও সুকৌশলে মোড়ানো ব্যাগপত্র তল্লাশি করার সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি এবং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তাদের ঘিরে ফেলে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

আরও পড়ুন: মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নের কৃষকদের দাবি মেনে নিয়ে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত

অভিযান চলাকালে ওই দুই নারীর সাথে থাকা দুটি বড় হাতব্যাগ তল্লাশি করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে স্কচটেপ ও প্লাস্টিক দিয়ে চারপাশ সম্পূর্ণ শক্তভাবে মোড়ানো অবস্থায় সর্বমোট ৯ (নয়) কেজি অবৈধ ও নিষিদ্ধ গাঁজা উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তীতে সংগৃহীত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আটককৃত এই দুই নারী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে একে অপরের আপন বোন। তাঁদের মধ্যে বড় বোনের নাম আছমা বেগম (বয়স আনুমানিক ৩৪ বছর) এবং অপরজনের নাম আমেনা বেগম। পুলিশের রেকর্ডপত্র ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, এই দুই নারী সুদূর ভোলা জেলার ঐতিহ্যবাহী লালমোহন উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অভিনব কায়দায় মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো পরিচিত সীমান্তবর্তী মাদকপ্রবণ অঞ্চলগুলো থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে এই নিষিদ্ধ গাঁজার চালান সংগ্রহ করে তারা নদীপথকে নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে চাঁদপুর লঞ্চঘাট হয়ে পরবর্তীতে মুন্সীগঞ্জ জেলার দিকে পাড়ি জমানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানা গেছে।

উদ্ধারকৃত বিশাল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, অভিযুক্ত দুই নারী এবং অন্যান্য আলামত জব্দের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আইনানুগ উপায়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এবং নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন করা হয়। সাক্ষীদের পূর্ণ উপস্থিতিতে জব্দকৃত ৯ কেজি গাঁজা এবং গ্রেপ্তারকৃত দুই বোন আছমা বেগম ও আমেনা বেগমকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত ও সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের প্রচলিত কঠোর আইন অনুযায়ী অবৈধ মাদক বহন ও সংরক্ষণের এই অপরাধের জন্য তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং রিমান্ড বা জেলহাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে থানা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই সফল অভিযান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদানকালে চাঁদপুর নৌ-থানার বিচক্ষণ ও কঠোর মনোভাবাপন্ন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজমগীর হোসাইন অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানান যে, আমাদের কাছে আসা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই আমরা এই দুই নারী মাদক কারবারিকে হাতেনাতে কাবু ও গ্রেপ্তার করতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়েছি। তিনি আরও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, জেলা পুলিশ সুপার মহোদয়ের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ রয়েছে যেন নদীপথের এই গুরুত্বপূর্ণ চাঁদপুর লঞ্চঘাট বা এর আশপাশের জলসীমায় কোনো অবস্থাতেই বিন্দু পরিমাণ মাদকদ্রব্য বা অবৈধ চোরাচালানের পণ্য পরিবহন করতে দেওয়া না হয়। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসন সব সময় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধরনের জনস্বার্থবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনের লক্ষে আমাদের ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, নদীমাতৃক বাংলাদেশের জলপথগুলোকে নিরাপদ রাখতে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে নৌ-পুলিশের এ ধরনের তৎপরতা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অভিনব কায়দায় ব্যাগের ভেতরে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে গাঁজা পাচারকালে দুই বোনের এই ধরা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে দেয় যে, অপরাধীরা যতই চতুর হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও সততার কাছে তারা পার পাবে না। সাধারণ জনগণের সহযোগিতায় এবং পুলিশ প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকারের ফলে আমাদের সমাজ ও যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার এই লড়াইয়ে সাফল্য আসবেই। চাঁদপুর লঞ্চঘাটের এই সফল অভিযান স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং মাদকের বিরুদ্ধে এক নতুন জনসচেতনতার সৃষ্টি করেছে।

সূত্র: চাঁদপুর নৌ-থানা প্রেস নোট ও পুলিশ প্রতিবেদন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন