সাইবার সুরক্ষা আইনে বড় পরিবর্তন: গুজব ও অপপ্রচারে বাড়ছে শাস্তি, যুক্ত হচ্ছে নতুন ধারা

সাইবার সুরক্ষা আইনে বড় পরিবর্তন: গুজব ও অপপ্রচারে বাড়ছে শাস্তি, যুক্ত হচ্ছে নতুন ধারা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

অনলাইন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া খবর এবং ব্যক্তির সম্মানহানি রোধে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিদ্যমান ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ পুনরায় সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই খসড়া সংশোধনীতে বেশ কিছু নতুন ধারা ও অপরাধের পরিধি যুক্ত করার পাশাপাশি শাস্তির মেয়াদ ও অর্থদণ্ডের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য প্রকাশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরও জোরালো করতেই এই পদক্ষেপ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আরও পড়ুন: ইউটিউবের নতুন মনিটাইজেশন নীতিমালা: এআই ভিডিও দিয়ে আয় বন্ধের কঠোর সিদ্ধান্ত

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্নকরণ এবং মানহানি—এই চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে স্পষ্টভাবে অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন আইনে এই অপরাধগুলোর বিচার ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেবল পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না থেকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য ক্ষমতাপ্ত সংস্থাসমূহকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদের আগামী আসনেই সংশোধিত এই বিলটি উত্থাপন এবং পাসের জন্য পেশ করা হতে পারে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ২৬/ক নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারা সংযোজনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সাইবার স্পেসে গুজব কিংবা অসত্য তথ্য ছড়ানোকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নতুন এই ধারার অধীন কোনো ব্যক্তি যদি অনলাইনে বা যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ ও প্রচার করেন, তবে তিনি সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এই সংশোধনীতে গুজবের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, এমন কোনো অপ্রমাণিত বা যাচাইহীন তথ্য ও সংবাদ, যা জনসাধারণের মনে অসন্তোষ, আতঙ্ক, ভীতি বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বা করতে পারে, তাকেই গুজব বলে গণ্য করা হবে।

আরও পড়ুন: নেছারাবাদে গভীর রাতে গৃহবধূর ঘরে গ্রাম্য চিকিৎসক, আটক ও ভিডিও ভাইরালে তোলপাড়

একই সাথে অপতথ্যের সংজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যে মিথ্যা, বিকৃত ও মনগড়া বক্তব্য প্রচার করা হয়, তা-ই অপতথ্য হিসেবে গণ্য হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া অডিও, ডিপফেক ভিডিও এবং এডিটেড বা বিকৃত ছবি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার যে প্রবণতা বেড়েছে, তা প্রতিরোধেও কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই ধরনের মানহানিকর উপাদান তৈরি বা ছড়ানোর ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনকারীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

আইনের ২৫ নম্বর ধারায় নতুন দুটি শব্দ অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধনী আনা হচ্ছে। এই ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কেউ কারোর সম্মানহানি বা সামাজিকভাবে হেয় করার অভিপ্রায়ে কোনো অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট, ছবি কিংবা এআই দিয়ে তৈরি কোনো তথ্য বা গ্রাফিক্স প্রচার করেন, তবে তিনি অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন। সাধারণ ক্ষেত্রে এই অপরাধের সাজা ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড নির্ধারিত রয়েছে। তবে ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু হন, তবে অপরাধের মাত্রা গুরুত্ব বিবেচনা করে সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে মানহানির বিষয়টি দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা অনুযায়ী বিচার্য হবে।

সরকারি সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি, দায়িত্বশীল পদে থাকা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশ্য করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে শুধু ব্যক্তিবিশেষের সম্মানহানি ঘটছে না, বরং দেশ ও সরকারের সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দেশের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতেই আইনটি দ্রুত পরিমার্জন করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল করতে এই সংশোধিত আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সূত্র: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগ।

1 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন