প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী জেলা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত দিনাজপুরের অভ্যন্তরীণ জনপদে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। আধুনিক যুগে বিভিন্ন ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধপত্র যখন একশ্রেণির অসাধু চক্রের খপ্পরে পড়ে ভয়ংকর নেশাদ্রব্যে রূপান্তরিত হয়, তখন তা সমগ্র সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক বা নিউরোলজিক্যাল ওষুধ রোগীর চরম কষ্টের উপশম করার জন্য নির্ধারিত থাকলেও, সেগুলোর যত্রতত্র অপব্যবহার এবং অবৈধ কারবারের মাধ্যমে যুবসমাজকে ধ্বংস করার এক নীল নকশা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। উত্তরবঙ্গের এই জনবহুল জনপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত সফল ঝটিকা অভিযানে প্রায় পাঁচ হাজার পিস অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিষিদ্ধ টাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ একজন নারী মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করার সংবাদ পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত পটভূমি এবং পুলিশ প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত অনুসন্ধানী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এই চাঞ্চল্যকর অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল দিনাজপুর জেলার নির্দিষ্ট একটি সংবেদনশীল এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু গোপন সংবাদ আসছিল যে, একটি সংঘবদ্ধ মাদক পাচারকারী চক্র পর্দার আড়ালে থেকে সাধারণ কুরিয়ার সার্ভিস কিংবা সুকৌশলী অভিনব পন্থায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় মাদকের চালান এনে স্থানীয় বাজার এবং যুবসমাজের কাছে সরবরাহ করছে। এই সিন্ডিকেটের পেছনে নারী মাদক কারবারিরাও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছে, যারা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ এড়ানোর জন্য নিজেদের নারীত্বের সুযোগ নিয়ে এই অবৈধ কারবার চালিয়ে যায়। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনায় গঠিত বিশেষ গোয়েন্দা দল অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই চক্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং ঠিক উপযুক্ত মুহূর্তে ওই নারী মাদক কারবারির আস্তানায় বা চলাচলের পথে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাঁকে আটক করতে সক্ষম হয়।
অভিযান চলাকালীন সময় পুলিশ সদস্যরা ওই নারীর নিকট থেকে তল্লাশি চালিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় প্রায় পাঁচ হাজার (৫০০০) পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করেন, যা গুনে দেখার পর পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়। এত বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী ব্যথানাশক বা মারণাস্ত্র সদৃশ ট্যাবলেট একসঙ্গে উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে, এটি কেবল খুচরা কোনো বিক্রেতার কারবার নয়, বরং এর পেছনে একটি বড় ধরনের আন্তঃজেলা মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেট বা চক্র জড়িত রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী কারবারি এই বিশাল চালানের উৎস এবং এর সাথে যুক্ত অন্যান্য সহযোগীদের সম্পর্কে অসংলগ্ন তথ্য প্রদান করলেও, পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তাঁর দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করছে। উদ্ধারকৃত এই বিশাল পরিমাণ টাপেন্টাডল ট্যাবলেটগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে মাদক হিসেবে চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, যা যুবসমাজকে স্থায়ীভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক গভীর চক্রান্ত ছিল।
টাপেন্টাডল নামক ওষুধটি মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানে তীব্র ব্যথা বা ট্রমাটিক পেইন নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী অপিওয়েড জাতীয় ব্যথানাশক হলেও, বিগত কয়েক বছর ধরে এর অপব্যবহার এমন একটি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকার ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছে। মাদকসেবীরা এই ওষুধটিকে বিকল্প নেশার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করায় এর অপব্যবহার রোধে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিতভাবে বিশেষ নজরদারি এবং কঠোর অভিযান পরিচালনা করে আসছে। দিনাজপুরের এই ঘটনায় আটককৃত নারীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে যে, শুধু ওই নারীকে গ্রেপ্তার করেই তাদের অভিযান শেষ হচ্ছে না, বরং এই বিশাল পাঁচ হাজার পিসের টাপেন্টাডল চালানটি কোথা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর আসল মূল হোতা বা গডফাদার কে, তা উদঘাটন না করা পর্যন্ত এই মামলার তদন্ত অব্যাহত থাকবে।
দিনাজপুর জেলার সাধারণ সচেতন মানুষ, অভিভাবক এবং সুধী সমাজ পুলিশ প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রাখা হলে এলাকার যুবসমাজ অন্ধকার জগৎ থেকে রক্ষা পাবে। মাদকের মতো অভিশাপ সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন, তেমনি সামাজিকভাবে প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ সন্তানদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। অপরাধী নারী কিংবা পুরুষ যেই হোক না কেন, আইনের ফাঁকফোকর গলে যেন কেউ পার পেয়ে যেতে না পারে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হয়—এটাই এখন সর্বস্তরের মানুষের প্রধান দাবি। আমরা আশা করি, বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে এই চক্রের শিকড় এদেশ থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে এবং দিনাজপুরের মাটি অপরাধমুক্ত থাকবে।
সূত্র: জেলা পুলিশ প্রেস নোট ও গোয়েন্দা শাখা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।