প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গমনকারী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক বিপর্যয় সমগ্র উপমহাদেশজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং প্রবাসের মাটিতে তাদের জীবনহানির ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করার বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি আন্তর্জাতিক ও মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসার পবিত্র ও আশাব্যঞ্জক উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিনদেশি মাটিতে পা রাখার পর আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা যে কতখানি নিষ্ঠুর ও নির্মম হতে পারে, কলকাতার বুকে ঘটা এই সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তারই এক চরম ও মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে খোদাই হয়ে রইল। দুই দেশের সাধারণ মানুষ এবং医療 সংক্রান্ত কাজে ভ্রমণকারী পর্যটকদের আবাসস্থলগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি কতটা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এই অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনাটি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে এবং এক গভীর শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ১০০ কেজি নিষিদ্ধ আফ্রিকান মাগুর মাছ জব্দ ও ধ্বংস
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কলকাতার স্থানীয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে প্রাপ্ত দাপ্তরিক ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী ১৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বুধবার ভোররাত ২টার দিকে এই ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার অত্যন্ত পরিচিত ও ব্যস্ততম নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিট, যা সাধারণত ফ্রি স্কুল স্ট্রিট নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেখানকার একটি বহুতল আবাসিক হোটেলে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা যখন চারদিক গ্রাস করে রেখেছিল এবং হোটেলের ক্লান্ত ও ঘুমকাতুরে অতিথিরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বহুতল ভবনটির অভ্যন্তরে অবস্থিত 'শিখা ইন' নামক হোটেলটিতে হঠাৎ করেই বিকট শব্দে এসি বিস্ফোরণ ঘটে। এই আকস্মিক বিস্ফোরণের সাথে সাথেই আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনটিকে এক ভয়ংকর ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী সম্পূর্ণ অন্ধ করে ফেলে।
উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে জানা যায় যে, হোটেলটির অবকাঠামোগত নকশায় মারাত্মক ত্রুটি ছিল। ভবনের প্রবেশপথ অত্যন্ত সরু হওয়ার কারণে এবং জরুরি অবস্থায় বের হয়ে আসার জন্য কোনো ধরনের কার্যকর অগ্নি-নির্গমন বা ইমার্জেন্সি এক্সিট (Emergency Exit) ব্যবস্থা না থাকার কারণে চরম বিপদের মুখে পড়েন অতিথিরা। গভীর রাতে হঠাৎ করে চারদিক বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভরে যাওয়ায় এবং বের হওয়ার কোনো পথ খোলা না থাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা অতিথিরা হোটেলের ভেতরেই অসহায়ভাবে আটকা পড়ে যান এবং প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। দমকল বাহিনীর কর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও হোটেলের ভেতরকার ধোঁয়া ও সরু পথের কারণে উদ্ধারকাজে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত
দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার পর ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ কর্মীরা ভবনটির ভেতর থেকে সর্বমোট ৯ (নয়) জনের নিথর মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন, যা পুরো উদ্ধারকারী দলকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। উদ্ধারকৃত এই হতভাগ্য মৃতদেহগুলোর পরিচয় বিশ্লেষণ করে ভারতীয় প্রশাসন ও চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন যে, মর্মান্তিক এই আগুনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন নারী এবং অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো ১টি নিষ্পাপ ও অবুঝ শিশু রয়েছে। ভারতের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত চালিয়ে এই মর্মান্তিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন যে, নিহত হওয়া এই নয়জন মানুষই মূলত চিকিৎসাগত বিভিন্ন জটিলতার কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ভিনদেশের মাটিতে চিকিৎসার মতো একটি আশার আলো খুঁজতে গিয়ে এমন একটি নিষ্ঠুর আকস্মিক মৃত্যুর শিকার হতে হবে, তা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
প্রাথমিকভাবে নিহত ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা এবং তারা বাংলাদেশের ঠিক কোন কোন গ্রাম বা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য কলকাতা পুলিশ এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ টিম কাজ করে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে যে খুব দ্রুতই তাদের পরিচয় সম্পূর্ণরূপে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেবল প্রাণহানির ঘটনাই ঘটেনি, বরং আগুনে দগ্ধ হয়ে আরও অন্তত ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতার বিভিন্ন উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থাও অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যার ফলে দুই দেশের চিকিৎসাপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্রবাসে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করার ঘটনাটি দুই বাংলার মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে এবং শোকস্তব্ধ করে তুলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে এসি বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট আগুনে ৯ জন বাংলাদেশির এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে। হোটেলের মতো জনবহুল স্থানে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধক ব্যবস্থা এবং জরুরি নির্গমনের পথ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, এই দুর্ঘটনাটি তারই এক নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়ক বার্তা দিয়ে গেল। আমরা মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি—তিনি যেন এই দুর্ঘটনায় নিহত সকল বাংলাদেশির বিদেহী আত্মাকে চিরশান্তি দান করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দেন। একই সাথে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বজনদের কোলে ফিরে আসতে পারেন, এটাই আমাদের সকলের নিকট আজ সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ও প্রার্থনা।
সূত্র: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, পুলিশ প্রেস নোট ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।