মেহেরপুরে পরীক্ষার হলে জালিয়াতি, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা

মেহেরপুরে পরীক্ষার হলে জালিয়াতি, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শিক্ষাঙ্গনে চরম অনিয়ম ও অসদুপায় অবলম্বনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং পেশাগত সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলায় অবস্থিত কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থলে এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) অধীনে অনুষ্ঠিত ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে বই খুলে লেখার দৃশ্য ভিডিও ফুটেজে ধারণ করতে গেলে শিক্ষক ও কর্মচারীদের হামলার শিকার হন পেশাদার দুই সাংবাদিক। সংবাদ কর্মীদের মারধর, মোবাইল ও বুম মাইক্রোফোন ছিনতাই এবং একটি কক্ষে আটকে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন: কায়েমপুরে গণসংযোগে ব্যস্ত প্রার্থী হুমায়ুন কবির ও নেতা মাসুম

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার মেহেরপুরের কাজিপুর ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের 'ইংরেজি প্রথম পত্র' পরীক্ষা চলছিল। কেন্দ্রটিতে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে উন্মুক্ত বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালাতে যান সাংবাদিকরা। সেখানে যান বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল 'নাগরিক টেলিভিশন'-এর মেহেরপুর প্রতিনিধি রাব্বি আহমেদ এবং জাতীয় দৈনিক 'খবরের কাগজ'-এর প্রতিনিধি এস এম তারেক। পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতেই তারা দেখতে পান যে, পরীক্ষা কক্ষের নিয়মকানুন উপেক্ষা করে বহু পরীক্ষার্থী সরাসরি পাঠ্যবই খুলে উত্তরপত্রে লিখছেন।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক রাব্বি আহমেদ ও এস এম তারেক জানান, পরীক্ষার্থীদের অবাধে বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে পাঁচশত টাকা করে আদায়ের খবর পেয়েছিলেন তারা। এই চরম জালিয়াতির বাস্তব চিত্র ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করতে গেলে কেন্দ্রে দায়িত্বরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অপকর্ম ঢাকা দিতে তারা সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে শিক্ষকরা অনৈতিকভাবে তাদের ওপর চড়াও হন। বাধা দেওয়া সত্ত্বেও ভিডিও ধারণ করায় পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয় এবং সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় কেন্দ্রে উপস্থিত সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ঝুটের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

সাংবাদিকরা জানান, হামলার সময় তাদের ব্যবহৃত দুটি মূল্যবান মোবাইল ফোন এবং নাগরিক টেলিভিশনের বুম মাইক্রোফোন বলপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে দুই সাংবাদিককে কলেজের একটি ঘরে দীর্ঘক্ষণ তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে কৌশলে বের হয়ে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। প্রকাশ্য দিবালোকে পরীক্ষার হলে জালিয়াতি ঢাকা দিতে সাংবাদিকদের ওপর এমন সন্ত্রাসী কায়দায় হামলার ঘটনায় মেহেরপুরের কর্মরত সাংবাদিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

হামলা ও সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাহাবুবুর রহমান হাতাহাতি বা মারধরের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করলেও অপ্রীতিকর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ভিডিও ধারণ নিয়ে শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের সাথে সাংবাদিকদের কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। তবে পরীক্ষা কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে দুজন কক্ষ পরিদর্শক শিক্ষককে পরীক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সাথে ঘটনার বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।

অভিযুক্ত শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লব মারধর ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরীক্ষার্থীদের বই দেখে লেখার কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। শিক্ষা সচেতন মহল মনে করেন, শিক্ষাঙ্গনে এমন জালিয়াতি এবং তা গোপন করতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনাটি জাতীয় গণমাধ্যমে আসার পর সর্বস্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মেহেরপুরের সাংবাদিক সংগঠনগুলো ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ছিনতাই হওয়া সরঞ্জাম উদ্ধার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছে।

সূত্র: মেহেরপুর প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণমাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন