প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ইসলামী ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক ঘটনা ও উপাখ্যান রয়েছে, যা মানবজাতির চিন্তার জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মহান আল্লাহ তাআলা কার জন্য কী বরাদ্দ করেছেন এবং কোন বিষয়টি কার জন্য চরম মঙ্গলজনক—তা একমাত্র তিনিই ভালো জানেন। মানুষ অনেক সময় বাহ্যিক অভাব-অনটন বা কষ্ট দেখে আকুল হয়ে পড়ে, কিন্তু সেই অবস্থার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মহাকৌশল অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। হযরত মুসা আলাইহিস সালামের জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা এবং বিশ্বখ্যাত পারস্যের কবি ও দার্শনিক আল্লামা শেখ সাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রজ্ঞাপূর্ণ বিশ্লেষণ মানুষকে তাকদির ও রিজিকের গূঢ় রহস্য বুঝতে দারুণভাবে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুস কাণ্ড: ভাতের টেবিলেও অর্থ আদায়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, আল্লাহর নবী হযরত মুসা (আঃ) একদা কোনো এক উদ্দেশ্যে পথ অতিক্রম করছিলেন। যাত্রাপথে তিনি এক চরম দুর্দশাগ্রস্ত ও অতি দরিদ্র মানুষের দেখা পান। লোকটির পরিধানে ন্যূনতম কোনো পোশাক ছিল না। লজ্জা নিবারণের তাগিদে সে নিজেকে প্রখর উত্তপ্ত বালির নিচে ঢেকে অলস ও অসহায় অবস্থায় বসে ছিল। আল্লাহর নবীকে পথ দিয়ে যেতে দেখে লোকটি অত্যন্ত আকুতি জানিয়ে বলে ওঠে যে, তিনি যেন আল্লাহর কাছে তার সচ্ছলতা ও বাঁচার জন্য সামান্যতম হলেও রিজিকের জন্য একটু বিশেষ দোয়া প্রার্থনা করেন। কারণ চরম অভাব ও অনাহারের নির্মম কষাঘাতে তার জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ফকিরের এই আকুল মার্জনা ও করুণ অবস্থা দেখে মহানবী হযরত মুসা (আঃ)-এর অন্তরে গভীর অনুকম্পা ও দয়ার উদ্রেক হয়। তিনি কালবিলম্ব না করে মহান রব্বুল আলামিনের দরবারে লোকটির অভাব দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান সুসংহত করার উদ্দেশ্যে আন্তরিক প্রার্থনা করেন। নবী রাসুলদের দোয়া কবুল হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়ম। আল্লাহর অশেষ রহমতে কিছুদিনের মধ্যেই ওই লোকটির অবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে এবং সে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে।
এর কিছুদিন পর হযরত মুসা (আঃ) পুনরায় সেই একই পথ দিয়ে নিজ গন্তব্যে ফিরছিলেন। তবে এবার তিনি দেখতে পান ওই স্থানে মানুষের এক বিরাট জনসমাগম ও ভিড়। কৌতূহলবশত তিনি সেখানে উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞেস করেন যে সেখানে আসলে কী ঘটেছে। তখন উপস্থিত জনতা তাকে অবহিত করে যে, কিছুদিন আগে যে বস্ত্রহীন ভিক্ষুকটি বালুর নিচে শরীর ঢেকে পড়ে থাকত, সে হঠাৎ অলৌকিকভাবে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়ে যায়। কিন্তু সম্পদ পাওয়ার পর সে সৎপথে পরিচালিত না হয়ে মদপান ও অনৈতিক আচরণে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে মাতাল অবস্থায় ঝগড়ায় জড়িয়ে সে এক নির্দোষ ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করে বসে। ফলে ইসলামী শরিয়াহর বিচারিক বিধান অনুযায়ী এখন তার 'কিসাস' বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে হযরত মুসা (আঃ) মহান আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম ফয়সালার পরম সত্যতা স্বীকার করেন এবং নিজের এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দরবারে তওবা ও ইস্তেগফার পাঠ করেন।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে ভয়াবহ দাবানল: তেল আবিব ও জেরুজালেমের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ, জোর উদ্ধার অভিযান
এই বিখ্যাত শিক্ষণীয় ঘটনাটিকে সামনে রেখে আল্লামা শেখ সাদী (রহ.) অত্যন্ত চমৎকার কিছু দার্শনিক উপমা ও জীবনমুখী প্রবাদ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিড়ালের মতো শিকারি প্রাণীকে যদি উড়াল দেওয়ার জন্য ডানা দেওয়া হতো, তবে সে পৃথিবীর সমস্ত চড়ুই পাখির অস্তিত্ব বিলীন করে দিত। অর্থাৎ কোনো অসৎ বা দুর্বল ব্যক্তি হঠাৎ ক্ষমতা ও সম্পদ পেলে সে প্রায়শই অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে দার্শনিক প্লেটোর একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পিঁপড়ার পাখা না থাকাই উত্তম, কারণ ডানা গজালে সে বেপরোয়াভাবে উড়তে গিয়ে নিজেই নিজের দ্রুত বিনাশ ডেকে আনে।
পবিত্র কোরআনের সুররা আশ-শুরা-এর ২৭ নম্বর আয়াতেও পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা মানবজাতির এই মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্পষ্টভাষণে ঘোষণা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, যদি আল্লাহ তাঁর সমস্ত বান্দাকে একযোগে অঢেল ও সীমাহীন রিজিক দান করতেন, তবে তারা অবশ্যই পৃথিবীতে অহংকার ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করত। আল্লামা শেখ সাদী অত্যন্ত প্রাঞ্জল একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। যেমন একজন স্নেহশীল পিতা তাঁর ঘরে প্রচুর মধু থাকা সত্ত্বেও তীব্র জ্বরে আক্রান্ত সন্তানকে তা খেতে দেন না। কারণ পিতা ভালো করেই জানেন যে মধু পুষ্টিকর হলেও উচ্চ তাপে আক্রান্ত রোগীর জন্য তা জীবনঘাতী হতে পারে। ঠিক তেমনি মহান সৃষ্টিকর্তা যাকে যে অবস্থায় রেখেছেন, সেটিই তার আত্মিক ও পারলৌকিক সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে উত্তম। যিনি তোমাকে ধনী করেননি, তিনি তোমার ভালো-মন্দ তোমার নিজের চেয়েও বহুগুণ বেশি অনুধাবন করতে পারেন।
সূত্র: ইসলামী ইতিহাস ও আল্লামা শেখ সাদী (রহ.)-এর গুলিস্থান গ্রন্থ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।