প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ এবং ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাগুলোতে প্রায়শই মাটির নিচ থেকে বহুমূল্যবান প্রাচীন ভাস্কর্য ও মূর্তি আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর সংবাদ পাওয়া যায়। প্রাচীন আমলের বহুমূল্যবান কষ্টিপাথর দিয়ে তৈরি বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি পাচার করার উদ্দেশ্যে একশ্রেণির অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, যারা দেশের অমূল্য ঐতিহ্যকে গোপনে বিদেশে পাচার করার অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে। এই ধরনের অবৈধ চোরাচালান ও প্রাচীন নিদর্শন বেআইনিভাবে হাতবদল রোধ করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অত্যন্ত কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে এবং নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নওগাঁ জেলার সীমান্তবর্তী একটি শান্ত ও জনবহুল গ্রামীণ জনপদে এমনই এক প্রাচীন ও অমূল্য কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয় মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। পুলিশ প্রশাসনের সময়োপযোগী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ফলেই দেশের একটি অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের হাসপাতালে এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরণে ১৫ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত পঁচিশ আগস্ট তারিখে নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলার অন্তর্গত একটি নিভৃত গ্রামে এই মূর্তি উদ্ধারের ঘটনাটি সম্পন্ন হয়েছিল। নির্দিষ্ট ওই দিনটির বিকালের দিকে পোরশা থানাধীন জনবহুল ঘাটনগর ইউনিয়নের আওতাধীন ঘাটনগর কানাপাড়া গ্রামের সাধারণ কিছু মানুষের মাধ্যমে থানায় একটি গোপন সংবাদ এসে পৌঁছায়। স্থানীয় লোকজনের কণ্ঠে ভেসে আসা ওই সংবাদে জানানো হয়েছিল যে তাদের গ্রামের একটি নির্দিষ্ট পুকুরের পশ্চিম পাশের পানির ধার ঘেঁষে কাদা ও মাটির নিচে প্রাচীন আমলের কষ্টিপাথর সদৃশ একটি ভারী বস্তু পড়ে রয়েছে। এমন সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মহোদয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জেলার পুলিশ সুপারের দপ্তরে অবহিত করেন। নওগাঁ জেলার সম্মানিত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকেই পোরশা থানার একটি চৌকস পুলিশ দল দ্রুত ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
পুলিশের উদ্ধারকারী দলটি যখন নির্ধারিত স্থানে গিয়ে পৌঁছায়, তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল প্রায় সোয়া চারটা বেজে গেছে এবং চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ থমথমে ও কৌতূহলোদ্দীপক। স্থানীয় সাক্ষী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা ওই পুকুরের পাড়ের কাদা-মাটি খনন করে পরিত্যক্ত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা মূর্তিটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদে বাইরে বের করে আনে। প্রাথমিক ও অত্যন্ত সতর্কতামূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায় যে উদ্ধারকৃত এই প্রাচীন ভাস্কর্যটি সনাতন হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির দেবতা শ্রী বিষ্ণুর একটি ঐতিহাসিক মূর্তি। মূর্তিটির নিখুঁত কারুকার্য এবং পাথরের বৈশিষ্ট্য দেখে এটি যে অত্যন্ত প্রাচীন এবং বহুমূল্যবান কষ্টিপাথর দিয়ে তৈরি, সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন উপস্থিত আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা। সুদূর অতীতের কোনো এক সময়ে হয়তো কোনো দুষ্কৃতকারী চক্র এই মূর্তিটি চুরি করে কিংবা অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ওই পুকুরধারে ফেলে রেখে গিয়েছিল বলে পুলিশ ধারণা করছে।
আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল হওয়া ১২ জেলেকে ৯৯৯-এর কল পেয়ে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড
উদ্ধার করার পর থানা হেফাজতে নিয়ে এসে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই প্রাচীন মূর্তিটির মাপজোখ ও বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, উদ্ধারকৃত এই বিষ্ণু মূর্তিটির উচ্চতা আনুমানিক প্রায় পঁচিশ ইঞ্চি এবং এর প্রস্থ পরিমাপ করা হয়েছে এগারো ইঞ্চি পর্যন্ত, যা বেশ বড় আকৃতির একটি প্রত্নসম্পদ। এছাড়া দাঁড় করিয়ে ডিজিটাল ও সনাতন পদ্ধতিতে ওজন পরিমাপ করার পর দেখা গেছে যে মূর্তিটির মোট ওজন প্রায় উনিশ কেজি আটশত গ্রাম বা প্রায় বিশ কেজির কাছাকাছি। প্রাচীন এই বহুমূল্যবান পাথরের মূর্তিটির বর্তমান বাজারদর যাচাই করে পুলিশ জানিয়েছে যে এর আনুমানিক মূল্যের পরিমাণ প্রায় দশ লক্ষ টাকারও অধিক হতে পারে, যা এটিকে অত্যন্ত মূল্যবান করে তুলেছে। এই ধরনের দুষ্প্রাপ্য কষ্টিপাথরের মূর্তি অবৈধভাবে সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার করার একটি বড় চক্র এই অঞ্চলে সক্রিয় থাকতে পারে বলে পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখছে।
পোরশা থানার দায়িত্বশীল অফিসার ইনচার্জ গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিশ্চিত করেছেন যে উদ্ধারকৃত এই মূল্যবান মূর্তিটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ হেফাজতে থানায় সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য এবং এর নেপথ্যে থাকা মূলহোতাদের খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলমান রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এই অমূল্য সম্পদটি যথাযথ নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া খুব শীঘ্রই সম্পন্ন করা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদে এই ধরনের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এ দেশের মাটিতে লুকিয়ে রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহু অমূল্য ও সুদৃশ্য নিদর্শন। সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় প্রশাসনের এমন সম্মিলিত সচেতনতার ফলেই অপরাধীরা তাদের অবৈধ উদ্দেশ্য সফল করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং দেশের ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, নওগাঁর পোরশায় কাদা-মাটির নিচ থেকে প্রায় বিশ কেজি ওজনের কষ্টিপাথরের এই বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধারের ঘটনাটি দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য। ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তাৎক্ষণিক তৎপরতা ও পেশাদারিত্ব সত্যিই প্রশংসার দাবিদার এবং এটি সমাজের প্রতিটি মানুষকে অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রাচীন সম্পদ পাচারের সঙ্গে জড়িত দুষ্টচক্রের সকল সদস্য আইনের আওতায় আসবে এবং কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। আমাদের দেশের অমূল্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের এই ধরনের দায়িত্বশীল ও সজাগ ভূমিকা সর্বদা অব্যাহত থাকুক—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলের একান্ত কামনা।
প্রতিবেদনের সূত্র: পোরশা থানা ও জেলা পুলিশ প্রেস উইং।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।