পাবনায় চড়া দামে সার বিক্রি, ডিলারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা

পাবনায় চড়া দামে সার বিক্রি, ডিলারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পাবনা সদর উপজেলার অধীনস্থ সাদুল্লাপুর ইউনিয়নে কৃষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত মূল্যের সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারে পাচারের গুরুতর অভিযোগে এক তালিকাভুক্ত ডিলারকে বিপুল অংকের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। সরকারি আইন অমান্য করে খুচরা বাজারে সাধারণ চাষিদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলার অপরাধে অভিযুক্ত ওই বিসিআইসি সার ডিলারকে এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে কঠোর শাস্তির আওতায় আনে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার প্রাক্কালে সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা শ্রীকোল বাজারে উপস্থিত হয়ে এই বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তামারা তাসবিহা। প্রশাসন ও সুনির্দিষ্ট তদন্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মেসার্স আফতাব ট্রেডার্স নামক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা উপায়ে অসদুপায় অবলম্বন করে আসছিলেন।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে রংধনু মডেল স্কুলের কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কৃষি অফিসের যৌথ তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব অনিয়মের চিত্র। অভিযুক্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত রাসায়নিক সার প্রকৃত কৃষকদের কাছে সরকার নির্ধারিত সুলভ মূল্যে সরবরাহ না করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করত। এরপর গোপনে বেশি লাভের আশায় ইউনিয়নের বিভিন্ন মোড়ের অবৈধ অ-তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতা ও কালোবাজারিদের কাছে সেই সার চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। সাধারণ কৃষকেরা যখন চাষাবাদের মূল মৌসুমে সারের জন্য আফতাব ট্রেডার্সে ধরণা দিতেন, তখন তাঁদের সার নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হতো কিংবা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অত্যন্ত চড়া দাম হাঁকানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারিভাবে প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা মূল্যের বরাদ্দকৃত বিশেষ সার ১ হাজার ৫৩০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করা হতো, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অপরাধমূলক কাজ।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনাকারী দলটি সরজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পারে যে, কেবল নির্দিষ্ট এক ধরণের সার নয়, বরং নাইট্রোজেনভিত্তিক ইউরিয়া ও পটাশ সারের দামেও ব্যাপক কারচুপি চালানো হচ্ছিল। সরকার নির্ধারিত প্রতি বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা মূল্যের ইউরিয়া সার ধূর্ত ওই ব্যবসায়ী বিক্রি করছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত চড়া মূল্যে। একই সাথে কৃষকদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ১ হাজার টাকা মূল্যের এমওপি বা পটাশ সার বিক্রি করা হচ্ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা দরে। অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছাড়াও কৃষকের জন্য রক্ষিত এই সার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই গোপনে ট্রলি বা অন্য কোনো যানবাহনে করে অন্যত্র পাচার করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। উপরন্তু, সারের নায্য দাম দাবি করতে গেলে অসাধু ওই ব্যবসায়ী ও তাঁর কর্মচারীরা সাধারণ প্রান্তিক কৃষকদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ করতেন বলেও ভুক্তভোগীরা ক্ষোভের সাথে জানান।

আরও পড়ুন: উল্লাপাড়ায় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ

কৃষি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ কৃষকদের অধিকার রক্ষায় গৃহীত এই ঝটিকা অভিযানের সময় পাবনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাকিরুল ইসলামসহ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামারা তাসবিহা জানান, ভুক্তভোগী প্রান্তিক কৃষকদের সুনির্দিষ্ট মৌখিক ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা শ্রীকোল বাজারে এই তদারকিমূলক অভিযান পরিচালনা করেন। সরজমিনে গিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অসাধু পন্থায় অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং সার পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স আফতাব ট্রেডার্সকে সারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তামারা তাসবিহা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে কৃষির উৎপাদন সচল রাখা এবং প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে এক টাকাও বেশি মূল্যে সার বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো অসাধু ডিলার বা সার ব্যবসায়ী যদি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করে কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায়, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরণের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ডিলারশিপ বাতিলসহ আরও কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে বলে প্রশাসন থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঝটিকা অভিযানের পর স্থানীয় সাধারণ কৃষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

সূত্র: পাবনা প্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন