সংসদে ভূমি অফিসে ঘুষ দুর্নীতি নিয়ে তোলপাড়, মন্ত্রীর জবাব

সংসদে ভূমি অফিসে ঘুষ দুর্নীতি নিয়ে তোলপাড়, মন্ত্রীর জবাব
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শতভাগ ই-নামজারি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি খাজনা পরিশোধের যুগান্তকারী সুযোগ চালু হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের সাবরেজিস্ট্রি ও স্থানীয় ভূমি কার্যালয়গুলোতে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না এবং সাধারণ নাগরিকরা ক্রমাগত চরম প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে জাতীয় সংসদে তীব্র অসন্তোষ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে সেবা সহজ করার নানা সরকারি প্রচারণা থাকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ভোগান্তি কমেনি বলে আইনসভায় জোর আলোচনা শুরু হয়। রোববার (৩০ আগস্ট ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনুর কাছে অত্যন্ত জোরালোভাবে এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন যে, ডিজিটাল পদ্ধতির প্রসারের পরও দৃশ্যত ঘুষ লেনদেন বন্ধ হয়নি এবং সাধারণ জনগণ অফিসে গিয়ে হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট ৬ মাসের ফসল নয়: পটুয়াখালীতে নুরুল হক নুর

সংসদ সদস্যের উক্ত সুনির্দিষ্ট এবং ক্ষোভপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু জানান যে, ভূমি প্রশাসনের সার্বিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং সব ধরনের দুর্নীতি নির্মূল করতে সরকার সম্পূর্ণ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি সংসদকে অবহিত করে বলেন, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, অহেতুক বিলম্ব কিংবা নাগরিক হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান সরকার ভূমি খাতকে সম্পূর্ণ অনিয়মমুক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

জনসাধারণের সুবিধার্থে ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে একাধিক আধুনিক ডিজিটাইজড প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় রাখা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, ঘুষ দাবি বা হয়রানির শিকার হলে সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা সহজেই অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম ব্যবহার করতে পারছেন। এছাড়া সরকারি সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ সমাধানের সার্বিক জিআরএস (GRS) সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়মিত লিখিত আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো তাৎক্ষণিক তথ্য ও দ্রুত অভিযোগ জানানোর সুবিধা সংবলিত বিশেষ '১৬১২২' হটলাইন সেবাটি ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অভিযোগ নিবেশিত করতে পারেন। মন্ত্রী জানান, এসব চ্যানেলে প্রাপ্ত প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে সমাধান করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে গর্ভবতী নারীর পেটে লাথির অভিযোগ, সন্তানহানি

তবে জাতীয় সংসদে আলোচনা চলাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে আসে। উপস্থিত আইনপ্রণেতারা লক্ষ্য করেন যে, ভূমি কার্যালয়গুলোতে ঘুষ বা আর্থিক অনিয়মের দায়ে এ পর্যন্ত ঠিক কতজন অসাধু কর্মকর্তা, সাবরেজিস্ট্রার কিংবা তহসিলদারের বিরুদ্ধে কার্যকরী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান উপস্থাপন করতে পারেননি ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। পরিসংখ্যানে এই অস্পষ্টতার কারণে সংসদে উপস্থিত সদস্যদের একাংশের মধ্যে আংশিক ক্ষোভ ও অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়। তাঁরা দাবি করেন যে, শুধু ডিজিটাইজেশন বা অভিযোগের কথা না বলে অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত দণ্ডমূলক পদক্ষেপের সঠিক হিসাব প্রকাশ করলে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে দুর্নীতি করার প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

উল্লেখ্য, দেশের সাধারণ জনগণকে ভূমি রেজিস্ট্রি ও নামজারি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিল প্রশাসনিক প্রথা ও দালাল চক্রের কবল থেকে মুক্তি দিতে সরকার সমগ্র দেশে শতভাগ ই-নামজারি এবং অনলাইনে ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায় ব্যবস্থা চালু করেছিল। পরিকল্পনা ছিল এই ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবেন, যার ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও ঘুষখোর কর্মকর্তাদের অবৈধ উপার্জনের পথ বন্ধ হবে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, অনলাইন আবেদন বা সেবা গ্রহণ করলেও স্থানীয় ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসে ভৌত ফাইলের অনুমোদনের জন্য এখনও অসাধু কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিতে বাধ্য হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ না দিলে ভুয়া ভুলত্রুটি দেখিয়ে আবেদন বাতিল বা মাসের পর মাস আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় সংসদে এমন বাস্তবধর্মী ও সংবেদনশীল আলোচনা সরাসরি প্রচারিত হওয়ার পর দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যে নতুন করে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাগরিকরা আশা প্রকাশ করছেন, সংসদ সদস্যের এই সাহসী প্রশ্নের পর ভূমি মন্ত্রণালয় আরও বেশি তৎপর হবে। কেবল অনলাইন ব্যবস্থা চালু রাখাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত ঝটিকা তদারকি ও নজরদারি টিম পাঠানো প্রয়োজন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনলে তবেই দেশে একটি সত্যিকারের স্বচ্ছ, জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সূত্র: জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংসদীয় প্রশ্নোত্তর অধিবেশন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন