প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে থাকা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, প্রাচীন কৃষ্টি এবং পুরোনো সংস্কৃতির নিদর্শনগুলো আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুগ যুগ ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শত শত বছর ধরে টিকে থাকা এই সমস্ত প্রাচীন ধর্মীয় উপাসনালয় এবং ঐতিহাসিক সেবাশ্রমগুলো কেবল নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের প্রার্থনার স্থানই নয়, বরং এগুলো পারস্পরিক সম্প্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং মানবকল্যাণের এক একটি জীবন্ত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী, নদীমাতৃক এবং ঐতিহাসিক জনপদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার অভ্যন্তরীণ শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশের মাঝে অবস্থিত তেমনি একটি শতবর্ষের পুরনো ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান হলো বেতকান্দি শ্রী শ্রী গজেন্দ্র সেবাশ্রম। কালের প্রবাহে এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রাচীন এই সেবাশ্রম ও এর অভ্যন্তরীণ প্রার্থনা কক্ষগুলো যখন সংস্কার ও আধুনিকায়নের চরম প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল, ঠিক তখনই স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত আশা এবং আকুতির সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের অত্যন্ত শুভ দিনটি অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের সোমবারের সকালে শাহজাদপুর উপজেলার এই ঐতিহাসিক ও শতাব্দী প্রাচীন বেতকান্দি শ্রী শ্রী গজেন্দ্র সেবাশ্রম প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য, জাঁকজমকপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন রাধাগোবিন্দ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো জরাজীর্ণ অবকাঠামোকে পেছনে ফেলে একটি আধুনিক, শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন নতুন মন্দির ভবন গড়ে তোলার এই মহৎ উদ্যোগের মূল নেপথ্যে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের সফল প্রতিমন্ত্রী প্রফেসর ডক্টর এম এ মুহিত। তাঁর ঐকান্তিক সদিচ্ছা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ উন্নয়ন তহবিল থেকে সংগৃহীত সরকারি বিশেষ বরাদ্দের আর্থিক সহায়তায় এই ঐতিহাসিক মন্দিরের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, যা এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সর্বস্তরের মানুষের মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এনজিও পরিচালক আরিফুল ইসলামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত এই অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানে শাহজাদপুর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের এই পবিত্র মুহূর্তটি সমৃদ্ধ করার জন্য উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের অত্যন্ত কর্মঠ ও সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব দত্ত। তাঁর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক সম্প্রীতির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও বিশিষ্ট প্রতিনিধি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রভাবশালী ইউনিয়ন বিএনপি নেতা তোফাজ্জল হোসেন তোতা। দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের এমন শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ উপস্থিতি এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন।
এছাড়াও স্থানীয় এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক, প্রবীণ মুরব্বি এবং মন্দির পরিচালনা কমিটির অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ সদস্যবৃন্দের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি বর্ণিল ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক বাবু অতুল চন্দ্র সাহা, পেশাদার ও নির্ভীক সাংবাদিক সাগর বসাক, অমল কৃষ্ণ সাহা, আনন্দ কুমার সাহা, পরেশ পাল, জীবন কর্মকার, শম্ভুনাথ সাহা, সমির সাহা, নরেশ পাল, সুমন সাহা, মদন কর্মকার এবং অলোক সাহা সহ স্থানীয় গ্রামবাংলার আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও তরুণ সমাজসেবকরা। মন্দিরের পুরোহিত ও আয়োজকদের মন্ত্র উচ্চারণ এবং মঙ্গলপ্রদীপের আলোয় যখন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ-মুখে এক প্রাপ্তির আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতার ভাব ফুটে ওঠে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই পুণ্যভূমির উন্নয়নে প্রতিমন্ত্রী প্রফেসর ডক্টর এম এ মুহিতের এই বিশেষ বরাদ্দ প্রদানের জন্য উপস্থিত সকলে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় আয়োজকদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে যে, এই শতাব্দী প্রাচীন বেতকান্দি শ্রী শ্রী গজেন্দ্র সেবাশ্রমের সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মোট ১৪ শতক সুপরিসর জায়গার ওপর বর্তমানের এই দৃষ্টিনন্দন রাধাগোবিন্দ মন্দিরটি অত্যন্ত আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হবে। বিশাল এই ১৪ শতক জায়গাজুড়ে শুধু মূল মন্দিরই নয়, বরং ভক্তদের বসার স্থান, ধর্মীয় আলোচনার কক্ষ, প্রার্থনার সুবিন্যস্ত পরিবেশ এবং সেবাশ্রমের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। দীর্ঘ দেড় যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যারা এই সেবাশ্রমের দেখভাল করে আসছেন এবং এর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম অবশেষে সরকারের মন্ত্রী মহোদয়ের সহযোগিতায় বাস্তবায়নের পথে পা রাখায় তারা দারুণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। আগামী দিনে নির্মাণকাজ দ্রুত সমাপ্ত হলে এটি শুধু শাহজাদপুর উপজেলারই নয়, বরং পুরো সিরাজগঞ্জ জেলার একটি অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে সকলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, শাহজাদপুরের বেতকান্দি গ্রামে শতাব্দী প্রাচীন শ্রী শ্রী গজেন্দ্র সেবাশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিমন্ত্রী প্রফেসর ডক্টর এম এ মুহিতের সরকারি বরাদ্দে দৃষ্টিনন্দন রাধাগোবিন্দ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের এই ঘটনাটি কেবল একটি ইমারত নির্মাণের গল্প নয়, এটি হলো গ্রামীণ জনপদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার এক অসাধারণ মেলবন্ধন। রাজনীতি ও ভেদাভেদ ভুলে যখন এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি কল্যাণমূলক কাজের জন্য একসাথে হাত মিলিয়ে কাজ করেন, তখনই সমাজ এগিয়ে যায় আলোর পথে। আমরা আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অত্যন্ত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে এই মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং ভক্তরা তাদের আরাধ্য দেবতাকে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে এই পবিত্র স্থানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এমন সুন্দর দৃশ্য সবসময় শাহজাদপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের বুকে অম্লান হোক—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
সূত্র: স্থানীয় সংবাদাতা ও বেতকান্দি গজেন্দ্র সেবাশ্রম পরিচালনা কমিটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।