প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনবহুল ও কৌশলগত পয়েন্ট হলো ঝাউল ওভারব্রিজ এলাকা। এই সংবেদনশীল ও ব্যস্ততম এলাকার চারপাশের পরিবেশ ও জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মহাসড়কের সংলগ্ন স্থানগুলোতে যত্রতত্র ভারী নির্মাণসামগ্রী, পাথর এবং বালু লোড ও আনলোডের মতো মারাত্মক বেআইনি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। কোনো ধরনের সরকারি বৈধ অনুমোদন বা ইজারা ছাড়াই প্রকাশ্য দিবালোকে চলা এই বেপরোয়া কার্যক্রমে সড়ক ও জনপথের স্বাভাবিক গতিশীলতা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই জনদুর্ভোগ ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে একাধিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। এর ফলশ্রুতিতে জেলা প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপে পরিচালিত একটি কঠোর ঝটিকা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে হাতেনাতে সত্যতা মিলেছে এবং একজন অসাধু ব্যবসায়ীকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় অংকের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের এমপির গাড়িতে হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে উপজেলা জামায়াত
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূত্রে জানা গেছে যে, গত শনিবার (১৫ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) ঠিক বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সুযোগ্য সহকারী কমিশনার ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে কামারখন্দ উপজেলার উক্ত ঝাউল ওভারব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় এই বিশেষ মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ঝাউল এলাকার চালার গ্রামের মৃত আমজাদ সেখের সুযোগ্য পুত্র মো. শামীম (২৮) নামক একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অবৈধ পাথর ও বালু ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ঘটনাস্থলে অবৈধভাবে পাথর ও বালু স্তূপীকৃত করে তা ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে লোড-আনলোড করার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিবেশ আইন এবং মহাসড়ক রক্ষা সংক্রান্ত বিধিমালার সুস্পষ্ট লংঘন হওয়ায় বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ক্ষমতার বলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. শামীমকে নগদ ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বেআইনি কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
আরও পড়ুন: এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন, শিশু সাংবাদিক রাহাতকে নিয়ে শাহজাদপুরে আনন্দ সমাহার
তবে প্রশাসনের এই সাময়িক আইনি পদক্ষেপ ও জরিমানা আদায়ের পর পরই স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার এক নতুন মাত্রা উন্মোচিত হয়েছে। সরেজমিনে সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সামান্য কিছু সময় পার হতে না হতেই পুনরায় একই স্থানে দিবালোকের আলোয় বড় বড় পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড় করিয়ে আগের মতোই অবাধে পাথর ও বালু লোড-আনলোডের মহোৎসব শুরু করে দেয় সংশ্লিষ্ট অসাধু চক্রটি। প্রশাসনের নাকের ডগায় এ ধরনের আইনি নির্দেশ অমান্য করার নগ্ন চিত্র দেখে এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ ও পথচারীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটি বড় এবং যৌক্তিক প্রশ্ন জোরালোভাবে দেখা দিয়েছে যে, যদি খোদ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযਾਨ ও অর্থদণ্ড প্রদানের পরও এই অবৈধ ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয়, তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করবে কে এবং এদের বেপরোয়া দৌড়ঝাঁপ থামানোর ক্ষমতা আসলে কার হাতে রয়েছে?
স্থানীয় এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যমুনা সেতুর কেপিআই (Key Point Installation) এলাকার অন্তর্ভুক্ত এই ওভারব্রিজ, সংলগ্ন আন্ডারপাস এবং ব্যস্ততম মহাসড়কের দুই ধার দখল করে এভাবে ভারী নির্মাণসামগ্রী উঠানামা করার কারণে নিয়মিত মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ট্রাক থেকে ছড়িয়ে পড়া বালু ও পাথরের গুঁড়ো বাতাসে উড়ে চারপাশের পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে এবং তীব্র ধুলাবালির কারণে সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের চোখ-মুখসহ শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মহাসড়কের ওপর যত্রতত্র ভারী যানবাহন পার্কিং ও লোড-আনলোডের ফলে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও এলাকাবাসী অবিলম্বে এই অনিয়মের স্থায়ী প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, কেবল আকস্মিক কিছু জরিমানা বা লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ কর্মকাণ্ড চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে ঝাউল ওভারব্রিজ এলাকাসহ সমগ্র মহাসড়ক জুড়ে নিয়মিত টহল ও দীর্ঘমেয়াদী কঠোর প্রশাসনিক মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগের এই চিত্র পাল্টাবে না এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
সূত্র: জেলা প্রশাসন প্রেস নোট ও স্থানীয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।