প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত আসছে নানামুখী যুগান্তকারী পরিবর্তন ও পরিবর্ধন। এরই ধারাবাহিকতায় টেক জায়ান্ট গুগল তাদের জনপ্রিয় এআই প্ল্যাটফর্ম জেমিনি এবং অন্যান্য সৃজনশীল মডেলগুলোর ব্যবহারকারী ও কন্টেন্ট নির্মাতাদের জন্য অত্যন্ত চমৎকার এবং কাঙ্ক্ষিত একটি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এখন থেকে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা যেকোনো ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও-গানে দৃশ্যমান কোনো ধরনের বিরক্তিকর বা স্পষ্ট জলছাপ বা ওয়াটারমার্ক আর বাধ্যতামূলক থাকছে না। জেমিনি ব্যবহারকারীরা এখন সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছামাফিক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুব সহজেই এই দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক বা জলছাপটি নিজেদের সেটিংসে গিয়ে অন বা অফ করে নিতে পারবেন, যা প্রযুক্তিপ্রেমী ও সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত পেশাদারদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সুখবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, গ্রাফিক ডিজাইনার, ভিডিও এডিটর এবং বিভিন্ন পেশাদার কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে, এআই দিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন চমৎকার সৃষ্টি বা ডিজাইনে গুগলের পক্ষ থেকে যে দৃশ্যমান জলছাপটি যুক্ত করে দেওয়া হতো, তা অনেক সময়ই কাজের আসল নান্দনিক সৌন্দর্যকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করে দিত। একটি নিখুঁত ও পেশাদার ডিজিটাল আর্ট বা নকশার মধ্যে যখন এই দৃশ্যমান লোগো বা ওয়াটারমার্কটি বেমানানভাবে ভেসে উঠত, তখন কাজের স্বাভাবিক আকর্ষণ অনেকটাই কমে যেত। ক্রিয়েটর ও পেশাদারদের এই নানামুখী সমস্যার কথা গভীরভাবে অনুধাবন করেই গুগল তাদের জেমিনি, ফ্লোসহ অন্যান্য উন্নত এআই মডেলে এই নমনীয়তা বা স্বাধীনতা নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে নির্মাতারা এখন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তাদের সৃষ্টিগুলোকে আরও বেশি আকর্ষণীয়, নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: কাজিপুরে ২০ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক, ৬ মাসের কারাদণ্ড
তবে দৃশ্যমান জলছাপ বা ওয়াটারমার্ক সরিয়ে নেওয়ার বা তা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেওয়া হলেও এর মানে এই নয় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা কন্টেন্ট শনাক্ত করার প্রক্রিয়া বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে। গুগল অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহারকারীদের সৃজনশীল স্বাধীনতার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তার দিকটিও সমানভাবে বজায় রেখেছে। গুগল জেমিনি বিভাগের সম্মানিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ উডওয়ার্ড গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, খালি চোখে দৃশ্যমান জলছাপটি ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দমতো সরাতে পারলেও প্রতিটি জেনারেটেড কন্টেন্টের ভেতরে গুগলের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী 'সিন্থ আইডি' (SynthID) নামের একটি বিশেষ অদৃশ্য ও গোপন জলছাপ বা ডিজিটাল তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এই গোপন ডিজিটাল সিগনেচারটি সাধারণ মানুষের খালি চোখে কখনো দৃশ্যমান হবে না, তবে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে খুব সহজেই যাচাই করে নিখুঁতভাবে ধরে ফেলা সম্ভব হবে যে নির্দিষ্ট ছবিটি, ভিডিওটি বা গানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কি না।
নতুন এই সুবিধাটি উপভোগ করার জন্য ব্যবহারকারীদের খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জেমিনির অফিশিয়াল সেটিংস অপশনে এই ফিচারটি যুক্ত হয়ে যাবে, যেখানে প্রবেশ করে ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দৃশ্যমান জলছাপটি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার অপশনটি সহজেই খুঁজে পাবেন। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গুগল আরও একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ‘ক্রেডেনশিও’ (Credencio) নামক সম্পূর্ণ নতুন একটি সফটওয়্যার উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই বিশেষ সফটওয়্যারটির মূল কাজ হলো কন্টেন্ট নির্মাতাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট, প্ল্যাটফর্ম বা সফটওয়্যারে এআই দ্বারা তৈরিকৃত কন্টেন্ট যাচাই করার একটি স্থানীয় ও নিজস্ব ব্যবস্থা বা লোকাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম যুক্ত করার সুযোগ করে দেওয়া। এর মাধ্যমে ডিজিটাল কন্টেন্টের সত্যতা যাচাইয়ের কাজটি আরও অনেক বেশি সহজ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কন্টেন্টের সত্যতা, উৎস এবং পরিচয় নিশ্চিত করার এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে অন্যান্য সমস্ত প্রযুক্তি জায়ান্ট ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টেক্কা দিতে গুগলের এই কৌশলগত পদক্ষেপ অত্যন্ত দূরদর্শী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে যেমন ব্যবহারকারীদের কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই গোপন ডিজিটাল ওয়াটারমার্কের মাধ্যমে জালিয়াতি বা অপব্যবহার রোধের শক্তিশালী ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গুগলের এই বহুমুখী উদ্যোগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে এবং আগামী দিনে এআই প্রযুক্তির বাজারে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন।
সূত্র: টেকক্রাঞ্চ ও গুগল এআই ব্লগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।