প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়কপথে এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক পথ দুর্ঘটনা ঘটেছে। দাঁড়িয়ে থাকা একটি মালবাহী যানবাহনের সাথে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা সিএনজিচালিত অটোরিকশার তীব্র ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই চালকসহ দুইজনের করুণ অকাল মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এই পথ দুর্ঘটনায় অটোরিকশায় থাকা অপর এক যাত্রী অত্যন্ত গুরুতরভাবে জখম হয়ে বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখ প্রথম প্রহরে ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদ সীমানার অন্তর্ভুক্ত বহুতী চারা বটতলা নামক এলাকায় অত্যন্ত মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাবলি সংঘটিত হয়। সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সংযোগ মহাসড়কে দিন শুরুর প্রাক্কালে ঘটা এই দুর্ঘটনায় সমগ্র এলাকা জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সংগৃহীত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, শুক্রবার ভোরে সিরাজগঞ্জের বাজার ভদ্রঘাট এলাকা থেকে কয়েকজন যাত্রীকে সাথে নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা সিরাজগঞ্জ জেলা শহর অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিল। যাত্রীবাহী বাহনটি বহুতী চারা বটতলা এলাকায় পৌঁছালে মহাসড়কের পাশে আগে থেকেই স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশালাকার ট্রাকের পেছনের অংশে সজোরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান যে, ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অথবা স্থির হয়ে থাকা ভারী ট্রাকটিকে দূর থেকে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে না পারার কারণে সিএনজিটি সরাসরি ট্রাকের পেছনের অংশে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয়। বাহন দুটির এই চরম আকস্মিক সংঘর্ষের ফলে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং অকুস্থলেই চালক ও এক যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে।
আরও পড়ুন: তিব্বতে কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে ফের প্লাবন, থমকে গেল উদ্ধারকাজ
ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিবর্গের পরিচয় নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাগণ। নিহতদের মধ্যে একজন হলেন অটোরিকশার চালক আশিক (৩৫)। তিনি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার কুঠির চর গ্রামের স্থায়ী অধিবাসী ছিলেন। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন রায়গঞ্জ উপজেলার কালিঞ্জা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ঠাকুর হালদার (৭০)। এছাড়া এই একই দুর্ঘটনায় বিষ্ণু হালদার নামে অটোরিকশার অপর এক যাত্রী চরমভাবে আহত হয়েছেন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তাঁকে স্থানীয় উদ্ধারকারীদের সহায়তায় অতি দ্রুত সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেখানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনতে পেয়ে ভোরবেলা আশপাশের ঘরবাড়ি ও সড়ক থেকে স্থানীয় অধিবাসীরা ও পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা সেখানে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত সিএনজির ভেতর থেকে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে থাকা দুইজনকে উদ্ধার করেন এবং জীবিত থাকা অপর যাত্রীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন। নিমিষেই দুর্ঘটনাটি ঘিরে উৎসুক ও শোকাকুল মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, মহাসড়কের পাশে কোনো প্রকার সতর্কতামূলক সংকেত বা আলো ছাড়া অনিয়মিতভাবে ভারী ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরণের যত্রতত্র ঝুঁকিপূর্ণ পার্কিং ভোরবেলার দিকে অন্যান্য ছোট হালকা যানবাহন ও যাত্রীদের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে।
আরও পড়ুন: ঝিনাইদহ বাইপাসে বাসচাপায় সেনা সদস্য স্বামী ও স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই সিরাজগঞ্জ সদর থানা পুলিশ ও স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দুর্ঘটনাকবলিত দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অটোরিকশাটি সড়ক থেকে সরিয়ে নিয়ে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করেন। একই সাথে নিহত দুই ব্যক্তির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয় এবং মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয় আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য অথবা স্বজনদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ প্রশাসন থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আকস্মিক এই দুর্ঘটনার পেছনে কোনো ধরণের অবহেলা বা ট্রাকটির নিয়মবহির্ভূত অবস্থান ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম চালনা করা হচ্ছে।
একই সাথে সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক মহাসড়কসহ আশপাশের শাখা সড়কগুলোতে অপ্রতুল সড়ক বাতি ও ভোরবেলার অন্ধকারের মধ্যে সকল চালককে সাবধানে গতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিচ্ছেন ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা। মহাসড়কে যত্রতত্র অবৈধভাবে গাড়ি থামিয়ে রাখা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি যানবাহন চালকদের দায়িত্বশীল আচরণের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। প্রিয়জনদের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক অকাল প্রয়াণে নিহতদের নিজ নিজ গ্রামে এখন স্বজনদের শোকার্ত কান্না ও আহাজারি চলছে। সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে নিস্তব্ধতার শোক।
সূত্র: স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।