প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মহামন্দা ও বাণিজ্য উত্তেজনার আবহ তৈরি করে ফের নতুন এক কূটনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত চড়া হারের শুল্ক কাঠামো চতুরতার সাথে পাশ কাটানো ও ফাঁকি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বহির্বিশ্বের অন্তত ৪০টিরও বেশি দেশ চীনকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করেছে বলে এক বিস্ফোরক দাবি উত্থাপন করেছে আমেরিকার প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু হোয়াইট হাউস। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারক ও বাণিজ্য পর্যবেক্ষকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, মেক্সিকো, কানাডা, ভারত, প্রগতিশীল জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিশ্বের শীর্ষ সারির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে চীনা উৎপাদিত বিবিধ পণ্যের চালান অবাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়েছে। এতে একদিকে যেমন মার্কিন সরকারের রাজস্ব নীতি চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট ২০২৬) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজস্ব বিভাগের নজরদারি প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই স্পর্শকাতর তথ্যটি বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়।
আরও পড়ুন: দৈনিক যুগের কথা কার্যালয়ে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি দল
হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক বিষয়ক পর্যালোচনা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করেছে যে, অসাধু এই বাণিজ্যিক কারসাজি সংঘটিত করার কারণে মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় রাজস্ব বিভাগকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিশাল অংকের শুল্ক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, এ ক্ষেত্রে 'ট্রান্সশিপমেন্ট' নামক এক বিশেষ অর্থনৈতিক ও রফতানিমূলক কৌশলের ব্যাপক প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত চীনা মূল রফতানি পণ্যসমূহকে প্রথমে তৃতীয় কোনো মধ্যবর্তী বন্ধুভাবাপন্ন দেশে সাময়িকভাবে জাহাজীকরণ ও পরিবহন করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত তৃতীয় দেশের বন্দরে বা শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পণ্যের বাইরের মোড়ক, মূল শিপমেন্ট প্যাকেজিং, বারকোড এবং রফতানি সংক্রান্ত শুল্ক দস্তাবেজ বা অফিশিয়াল কাগজপত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও সীমান্ত নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে পণ্যের প্রকৃত ভৌগোলিক উৎপত্তিস্থল বা অরিজিন চীন সংক্রান্ত মূল তথ্যটি সম্পূর্ণ আড়াল ও গোপন করা সম্ভব হয়। ফলে চীন থেকে সরাসরি আমদানির ওপর আরোপিত কড়া বাণিজ্য শুল্ক এড়াতে সক্ষম হচ্ছে চীনা রফতানিকারক ও আন্তর্জাতিক অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিনিধিদলের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই অতি স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জালিয়াতির অভিযোগ সরাসরি ও জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চীনের নীতি নির্ধারক ও অর্থনৈতিক মুখপাত্রদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা সামাল দিতে প্রতিনিয়ত অন্যান্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একপাক্ষিক শুল্ক আরোপের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। চীন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আগ্রাসী বাণিজ্যযুদ্ধে আসলে কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী বা লাভবান হতে পারে না, বরং বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল ধ্বংসের মুখে পড়ে সাধারণ ভোক্তা ও আন্তর্জাতিক বাজার ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হয়। পারস্পরিক সংঘাতমূলক অর্থনৈতিক কূটনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অবকাঠামোর জন্য মোটেও সুখকর নয় বলেও বেইজিং স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, থার্ড-পার্টি রুট ব্যবহার করে সংঘটিত এই বহুমাত্রিক শুল্ক ফাঁকি ও আন্তর্জাতিক পণ্য জালিয়াতি শনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা বিভাগ এখন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি সর্বাত্মকভাবে ব্যবহারের চূড়ান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। আধুনিক মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সংবলিত এআই সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিপিং কন্টেইনারের ট্র্যাকিং ডেটা, রুট হিস্ট্রি, কাস্টমস ডকুমেন্টের অসঙ্গতি এবং মোড়ক পরিবর্তনের সূক্ষ্ম জালিয়াতি অতি দ্রুত ও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ওয়াশিংটন। বাণিজ্য নিরাপত্তা রক্ষায় প্রযুক্তিগত সতর্কতার এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যের মোড় নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেবে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদগণ।
সূত্র: হোয়াইট হাউস প্রেস রিলিজ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।