প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) সংসদীয় আসনের সাবেক সফল সংসদ সদস্য, সরকারের সাবেক শিল্প উপমন্ত্রী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হাসিবুর রহমান স্বপনের আজ ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একজন আন্দোলনকারী ও শ্রমিক নেতা হিসেবে রাজনীতি শুরু করে পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ ও সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি। তাঁর এই প্রয়াণ দিবসে শাহজাদপুরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের আবহে স্মরণ করা হচ্ছে প্রবীণ এই জননেতাকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি শাহজাদপুরের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: কাহালুতে ৫০ পিস টাপেন্টাডলসহ আটক ২ মাদক কারবারি
বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসিবুর রহমান স্বপনের পারিবারিক জীবন ও রাজনৈতিক ভিত্তিভূমির সূচনা ঘটেছিল শাহজাদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে, তাঁর পৈতৃক আদি ভিটা ছিল শাহজাদপুর পৌর এলাকার পাঠানপাড়া গ্রামে। সেখানেই তাঁর পিতা ও পরিবারের সদস্যগণ বসবাস করতেন। পরবর্তীতে তিনি একই উপজেলার দ্বারিয়াপুর বাজার গ্রামের একটি সুপরিচিত পরিবারে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বৈবাহিক জীবনের পর তিনি মূলত দ্বারিয়াপুর ও ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও নিজ জন্মমাটি শাহজাদপুরের মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখেন। ষাটের দশকের শেষভাগে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের শ্রমিক নেতা হিসেবে তাঁর গণমুখী রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল।
হাসিবুর রহমান স্বপনের রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও নানা পরিবর্তনের অধ্যায়ে ভরা। জাতীয় রাজনীতির বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহনকারী এই নেতার রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তৎকালীন সরকার তাঁকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেছিল।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা ও বিশেষ করে শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে পরপর দুবার বিপুল সমর্থনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শুধুমাত্র সংসদীয় রাজনীতিই নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপেও তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শাহজাদপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি ভূমিকা রাখেন। তাঁর মেয়াদে শাহজাদপুরের ভৌত অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বহু কাজ বাস্তবায়িত হয়।
দল পরিবর্তনের নানান ঘটনা থাকলেও শাহজাদপুরের মানুষের সাথে হাসিবুর রহমান স্বপনের যে সাধারণ জনসম্পৃক্ততা ছিল তা এককথায় অসামান্য। দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তিনি সর্বস্তরের মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন। নিজের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও সদালাপী ব্যক্তিত্বের কারণে দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর একটি স্বকীয় পরিচয় গড়ে উঠেছিল। যে কারণে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীরাও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা করতেন। শাহজাদপুরের শ্রমজীবী মানুষ, তাঁতশ্রমিক ও সাধারণ কৃষকদের সাথে তাঁর আত্মিক বন্ধন ছিল তাঁর রাজনীতি ও যোগাযোগের মূল শক্তি।
শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে প্রবীণ এই জননেতা ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে পুরো শাহজাদপুর জুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। তুরস্ক থেকে তাঁর মরদেহ পরম শ্রদ্ধায় দেশে ফিরিয়ে আনার পর শাহজাদপুরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরিশেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজ এলাকা চুনিয়াখালীপাড়া মখদুমিয়া কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও শাহজাদপুরের মানুষ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।
সূত্র: পরিবার ও স্থানীয় উৎস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।