শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এক অবিচল নাম

শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এক অবিচল নাম

 জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শান্তিরক্ষা ও বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে এক গর্বিত অংশীদার

​বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে শান্তির বারতা পৌঁছে দিতে যে কটি দেশ সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত ২৯ মে পালিত হলো 'জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস'। এই বিশেষ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। 'শান্তিতে বিনিয়োগ'—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবার দিবসটি উদযাপিত হয়েছে, যেখানে শান্তিরক্ষীদের অসীম ত্যাগ ও সাহসিকতাকে গভীরভাবে স্মরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদানের স্বীকৃতি

​বর্তমানে জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫০ হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী কর্মরত আছেন। গর্বের বিষয় হলো, এই বিশাল বাহিনীর মধ্যে ৪ হাজারের অধিক সদস্যই বাংলাদেশের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্রুপক্ষের মাঝে উত্তেজনা প্রশমন, ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নির্বাচন আয়োজনসহ নানামুখী মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা। ১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দিয়েছেন, যার মধ্যে গত এক বছরেই শহিদ হয়েছেন ৫৯ জন। তাদের এই আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি: হোয়াইট হাউসের বৈঠকে সিদ্ধান্তহীনতা

ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি: হোয়াইট হাউসের বৈঠকে সিদ্ধান্তহীনতা

জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্তা ও বাংলাদেশের ভূমিকা

​জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শান্তিরক্ষীদের এই কার্যক্রমকে ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “যারা নিজের দেশ থেকে বহু দূরে গিয়ে শান্তির পথ তৈরি করছেন, তাদের সমর্থন দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।” বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শান্তিরক্ষীরা যে পেশাদারিত্ব এবং মানবিকতা প্রদর্শন করছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেছে। রাজনৈতিক সংঘাত নিরসন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এক পরীক্ষিত এবং কার্যকর শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন।

নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জ: জাতিসংঘের অঙ্গীকার

​শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমানে জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। মহাসচিব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর যেকোনো হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতির উন্নয়নে জাতিসংঘ তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন গুতেরেস।

সম্মাননা ও আগামী কর্মসূচি

​আগামী ৫ জুন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শান্তিরক্ষী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে নিহত বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন মহাসচিব গুতেরেস। একই সাথে নিহতদের মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড’ পদক প্রদান করা হবে। এছাড়া ‘ইউএন মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘ইউএন ওম্যান পুলিশ অফিসার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীদের কাজের উৎসাহ জোগাবে।

দিগন্ত বাংলা নিউজের বিশ্লেষণ

​বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা কেবল দেশের প্রতিনিধি নয়, তারা আজ বিশ্বের কোটি মানুষের ভরসার আশ্রয়। তাঁদের কাজের মাধ্যমেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। সংঘাত থেকে শান্তি—এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের অবদান বিশ্ববাসীর কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

​পরিশেষে বলা যায়, ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’—এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। আমাদের শান্তিরক্ষীদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাদের কার্যক্রমে পূর্ণ সমর্থন জোগানোই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন