জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর: বৈদেশিক আয়ে থাকছে না উৎসে কর
দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যে সকল ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশে আনেন, আগামী অর্থবছর থেকে তাদের আয়ের ওপর আর কোনো প্রকার ‘উৎসে কর’ (Tax at Source) কাটা হবে না। এই ঘোষণাটি তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আয়কর আইনে বড় সংশোধনী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার কাজ শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর অব্যাহতির ঘোষণা দেবেন। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক আয়কে এখন থেকে রেমিট্যান্সের মর্যাদায় বিশেষ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, তরুণ সমাজকে ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত সময়োপযোগী।
কেন ছিল এই কর বিতর্ক?
বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, দেশে অবস্থান করে কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে সেবা প্রদান করেন, তবে সেই আয়কে এতদিন ‘রেমিট্যান্স’ হিসেবে গণ্য করা হতো না। ফলে ব্যাংকগুলো অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের আনা অর্থের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখত। এই বিষয়টি নিয়ে ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: বিএনপি সরকারের ব্যর্থতায় খু'ন-ধর্ষ'ণ বেড়েছে: আসিফ মাহমুদ
তরুণ উদ্যোক্তাদের এই কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ‘চিত্ত মিডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা জুয়েল রানা। গত ১ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে তিনি এই করের বোঝা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেন।
এনবিআর-এর ঘোষণা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ফ্রিল্যান্সারদের উপার্জিত অর্থ এখন থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। ফলে এখন থেকে কোনো ব্যাংক আর এই অর্থের ওপর উৎসে কর কাটতে পারবে না। এছাড়া, যেসব ফ্রিল্যান্সারের হিসাব থেকে পূর্ববর্তী সময়ে কর কাটা হয়েছে, তাদের সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এরই মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে কর কর্তন স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক আয়ে কর না থাকলেও, দেশে থেকে যদি কোনো ক্রিয়েটর ব্র্যান্ড প্রমোশন বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে আয় করেন, তবে সেই আয়ের ওপর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হারে আয়কর দিতে হবে। অর্থাৎ, কেবল সরাসরি বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপরই এই কর অব্যাহতি কার্যকর থাকবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান
সরকারের এই সিদ্ধান্তটি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইশতেহারে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতে আট লাখ নতুন কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছিল দলটি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত ঋণ, স্টার্টআপ তহবিল এবং ১০ বছরের কর সুবিধার মতো প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। এই কর অব্যাহতি সেই ইশতেহার বাস্তবায়নের পথে একটি শক্তিশালী মাইলফলক।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বর্তমানে একটি উদীয়মান শিল্প। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এখন আর চাকরির পেছনে না ছুটে ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। সরকারের এই সাহসী সিদ্ধান্ত তরুণদের আরও বেশি উৎসাহিত করবে। এছাড়া এটি দেশের আইটি খাতের সক্ষমতাকে বিশ্ববাজারে আরও সুসংহত করবে। এটি কেবল অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, বরং এটি তরুণদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে।
সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা
সরকার কেবল ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধাই দেখছে না, বরং জনস্বার্থ রক্ষায় আরও বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নিত্যপণ্যের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত কর বাতিল করা, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার কর প্রত্যাহার, উত্তরাধিকার করের উদ্যোগ বাতিল এবং আবগারি শুল্কের হার বৃদ্ধিতে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা। সরকারের এই ‘ইউটার্ন’ বা জনবান্ধব সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।
উপসংহার
একটি আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আমরা আশা করি, সরকারি এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা আরও বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে যাবে। দিগন্ত বাংলা নিউজ সব সময় তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের পক্ষে সোচ্চার।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।