ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমাতে আদার কার্যকর ব্যবহার


ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমাতে আদার কার্যকর ব্যবহার
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

আধুনিক জীবনযাত্রার অনিয়ম, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের কারণে বর্তমান বিশ্বে যে কয়েকটি ব্যাধি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ফ্যাটি লিভার। যখন আমাদের লিভার বা যকৃতের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে, তখনই এই জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে এটি অলক্ষ্যে থাকলেও পরবর্তীতে তা লিভার সিরোসিস কিংবা লিভার অকার্যকর হওয়ার মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করতে পারে। প্রাকৃতিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানে লিভারের এই অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি গলাতে এবং যকৃতের প্রদাহ কমাতে রান্নাঘরের অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গুণাগুণে ভরপুর ভেষজ উপাদান 'আদা' দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সঠিক নিয়মে আদা সেবন করলে ওষুধ ছাড়াই ফ্যাটি লিভারের তীব্রতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আরও পড়ুন: প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে কার্যকর যেসব পুষ্টিকর ফল

আদার মধ্যে বিদ্যমান সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান জিনজেরল, শোগাওল এবং জিনজেরন শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বা প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে। এই উপাদানগুলো লিভারের ভেতরে জমা হওয়া অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড ও চর্বির অণুগুলোকে ভাঙতে সাহায্য করে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত আদা গ্রহণ করলে তা ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখার পাশাপাশি লিভারে নতুন করে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করে। এছাড়া আদা রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন উপাদানগুলো বের করে দিয়ে লিভার পরিষ্কার বা ডিটক্সিফাই রাখতে সাহায্য করে, যা ফ্যাটি লিভার নিরাময়ের প্রথম ধাপ।

ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দূর করতে আদা সেবনের সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলো গরম আদা চা বা আদা পানি। সকালে খালি পেটে বা ভারী খাবারের পর এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে এক চা চামচ আদা বাটা বা কাঁচা আদার রস মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। আদা পানির কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে এতে সামান্য পরিমাণ খাঁটি লেবুর রস মিশিয়ে নেওয়া যায়। লেবুর ভিটামিন সি এবং আদার জিনজেরল একসাথে মিলে লিভারের চর্বি গলানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। যারা সরাসরি আদার তীব্র ঝাঁঝ সহ্য করতে পারেন না, তারা হালকা গরম আদা চা তৈরি করে তার সাথে সামান্য খাঁটি মধু মিশিয়ে নিয়মিত পান করতে পারেন, যা পাচনতন্ত্রের সার্বিক উন্নতিতেও সাহায্য করে।

এছাড়া কাঁচা আদা চিবিয়ে খাওয়া বা সালাদের সাথে কুচি করে মিশিয়ে গ্রহণ করাও দারুণ লাভজনক। প্রতিদিন সকালে এক ছোট টুকরো কাঁচা আদা সামান্য ইষদুষ্ণ পানির সাথে চিবিয়ে খেলে লিভারের পাচক রস ও এনজাইম নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। কাঁচা আদায় বিদ্যমান এনজাইমগুলো চর্বি জাতীয় খাবার সহজে হজম করতে সাহায্য করে, ফলে লিভারের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে না। দুপুরের বা রাতের খাবারের সালাদে কাঁচা আদা কুচি এবং সামান্য তিল বা পপি সিড মিশিয়ে গ্রহণ করলে পুষ্টিগুণ আরও বৃদ্ধি পায়। দৈনন্দিন তরকারি ও সুপ রান্নায় কৃত্রিম মশলার পরিবর্তে কাঁচা আদা বাটার ব্যবহার বৃদ্ধি করাও একটি ভালো অভ্যাস।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নারীদের স্বাবলম্বী ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ড. এম এ মুহিতের বিশেষ উদ্যোগ!

আদা কেবল লিভারের ফ্যাট কমায় না, এটি সামগ্রিক পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে। তবে ফ্যাটি লিভারের রোগীদের ক্ষেত্রে এটি মনে রাখা জরুরি যে কেবল আদা খেলেই রাতারাতি লিভারের চর্বি উধাও হবে না। এর পাশাপাশি চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত তেলের খাবার, প্রসেসড ফুড ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি খাওয়ার পাশাপাশি নিয়ম মেনে সঠিক পরিমাণে আদা গ্রহণ করলে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে যাদের তীব্র অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে বা যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত আদা সেবনের আগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সমীচীন।

সংবাদ সূত্র: পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং দিগন্ত বাংলা নিউজ এর স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা সেল।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন