জাতীয় ডেস্ক, ২১ জুলাই ২০২৬:
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন এবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে থাকা সাবেক এই সেনা সদস্যকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য আনুষ্ঠানিক আর্জি জানিয়েছে প্রসিকিউশন দল।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলের কাছে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই বিশেষ আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র আবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, জামিন অযোগ্য ধারায় অভিযুক্ত এ আসামির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আজই ট্রাইব্যুনালে শুনানি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে হাজির ও বিচার প্রক্রিয়ার আইনি গতিধারা
প্রসিকিউশন টিম সূত্রে জানা গেছে, বিগত শতকের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সাথে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনের সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটিত হওয়ায় তাকে বিচারিক আদালতে হাজির করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি নথি ও নথিভিত্তিক প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।
এই আবেদনের ফলে একদিকে যেমন বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারিক কাজ ত্বরান্বিত হবে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে।
জেনারেল কোর্ট মার্শালে সেনাবিচারের সিদ্ধান্ত ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
এদিকে মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তারের পর তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেনা আইন অনুযায়ী জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমেই উক্ত সাবেক কর্মকর্তার বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
আরও পড়ুন: মিয়ানমার উপকূলে ভয়াবহ নৌকাডুবি: ৫৩০ রোহিঙ্গার সলিল সমাধি
সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর পিলখানায় অবস্থিত শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন:
- সহযোগীদের বিচার সম্পূর্ণ: "মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের পূর্বে গ্রেপ্তারকৃত অন্য সহযোগীদের বিচার সামরিক আদালতেই সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে তার ক্ষেত্রেও সামরিক আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না।"
- ছদ্মবেশে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সমাপ্তি: "সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা দীর্ঘ ৪৫ বছর যাবৎ নিজের আসল নাম-পরিচয় গোপন রেখে প্রতিবেশী একটি দেশে স্থায়ীভাবে আত্মগোপন করেছিলেন।"
- গোয়েন্দা নজরদারি ও সেনাবাহিনীতে হস্তান্তর: "আমাদের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এরপরই তাকে সামরিক আইনে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমেই তার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করবে কর্তৃপক্ষ।"
দীর্ঘ ৪৫ বছরের পলাতক জীবন ও বনানী থেকে গ্রেপ্তার
উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক ও আলোচিত মামলাগুলোর অন্যতম পলাতক আসামি হিসেবে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানীর একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে যৌথ গোয়েন্দা দল।
গ্রেপ্তারের পরবর্তী আইনি ও দাপ্তরিক ধাপ হিসেবে পরদিন (১৬ জুলাই) তাকে কড়া পাহারায় ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের (এমপি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তাকে সামরিক পাহারায় রাখা হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল ও সামরিক আদালতের জোড়া আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার শুরু হতে যাচ্ছে।
সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংগৃহীত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।