জাতিসংঘের দুই শীর্ষ সংস্থার দেওয়া যৌথ আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির তথ্যানুযায়ী, জীবন বাঁচাতে এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকা থেকে এই দুটি যাত্রীবাহী ট্রলার বা নৌকা সাগরের বুকে অবৈধভাবে রওনা দিয়েছিল। তাদের মূল গন্তব্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোনো নিরাপদ দেশ। জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিবেদনে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সাগরে নিমজ্জিত হওয়া প্রথম নৌকাটিতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত প্রায় ২৫০ জন যাত্রী বোঝাই করা ছিল। অন্যদিকে, তার কাছাকাছি সময়ে যাত্রা করা অপর আরেকটি বড় আকারের কাঠের নৌকায় আরোহী হিসেবে ছিলেন আরও প্রায় ২৬০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সিরাজগঞ্জে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ
আইওএম ও ইউএনএইচসিআর তাদের গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই অভিশপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় অংশ নেওয়া যাত্রীদের মধ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাখাইন রাজ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা স্থানীয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি একটি বড় অংশ ছিল বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করা নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্যরা। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে টেকনাফের শিবিরের বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষও এই মারাত্মক সমুদ্রযাত্রার নৌকায় সামিল হয়েছিলেন, যাদের শেষ পরিণতি এখন গভীর সাগরের তলদেশে।
১. জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, জুন মাসের একদম শেষ দিনগুলোতে রাখাইন উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করার পর প্রায় টানা দুই সপ্তাহ যাবত নৌকা দুটি সাগরের বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ে।
২. পরবর্তীতে গত ৮ জুলাই মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্গত ইরাওয়াদি উপকূলবর্তী গভীর সমুদ্র এলাকায় পৌঁছানোর পর নৌকা দুটির সাথে স্থলভাগের সকল প্রকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৩. সাগরের তীব্র ঢেউ ও প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে প্রথমে ২৫০ জন আরোহী নিয়ে যাত্রা করা ট্রলারটি ইরাওয়াদি বদ্বীপের নিকটবর্তী পানিতে উল্টে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায়।
৪. প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটার ঠিক কিছু সময় পরই তার একদম পেছনে থাকা ২৬০ জন যাত্রীসহ দ্বিতীয় নৌকাটিও উত্তাল সাগরের প্রবল স্রোতের তোড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুরোপুরি ডুবে যায়।
৫. জাতিসংঘের দুই সংস্থার দাবি, দুই নৌকার মোট ৫১০ জন যাত্রীর পাশাপাশি চালক ও পাচারকারী চক্রের সদস্যরাসহ মোট ৫৩০ জনেরই এই সলিল সমাধিতে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী আর নেই
এই বিশাল সংখ্যক মানুষের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ও শোকের ঝড় উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ মানবপাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা এবং বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও নিরাপত্তার চাপের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা অল্প টাকার বিনিময়ে উন্নত দেশের লোভ দেখিয়ে এই অসহায় মানুষদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইরাওয়াদি উপকূলের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও নিরাপদ রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সাগরে এমন লাশের মিছিল কোনোভাবেই থামানো সম্ভব নয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতি অবিলম্বে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিউজের সূত্র: জাতিসংঘের আইওএম ও ইউএনএইচসিআর যৌথ বিবৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।