কৃত্রিম নিউরনের সংকেতে সাড়া দিল জীবন্ত মস্তিষ্ক, প্রমার্জিত হচ্ছে ব্রেন-মেশিন প্রযুক্তি

কৃত্রিম নিউরনের সংকেতে সাড়া দিল জীবন্ত মস্তিষ্ক, প্রমার্জিত হচ্ছে ব্রেন-মেশিন প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

মানবমস্তিষ্কের জটিল স্নায়ুতন্ত্রের সাথে আধুনিক যন্ত্র কিংবা ডিজিটাল সিস্টেমের প্রত্যক্ষ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপনের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টায় এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রিন্টেড বা মুদ্রিত কৃত্রিম নিউরন থেকে প্রেরিত বৈদ্যুতিক সংকেতে অবিকল স্বাভাবিক নিয়মে সাড়াদান করেছে জীবন্ত স্নায়ুকোষ। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল প্রবিজ্ঞানী ও গবেষক এই যুগান্তকারী প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন। তাঁদের তৈরি কৃত্রিম নিউরনের সূক্ষ্ম স্পন্দনে ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে সংগ্রহ করা টিস্যুর স্নায়ুকোষসমূহ প্রাকৃতিকভাবে সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছে। এই অভূতপূর্ব আবিষ্কার ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI), চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিউরোপ্রস্থেটিক্স এবং ভবিষ্যৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) শক্তি-সাশ্রয়ী কম্পিউটিং প্রক্রিয়ায় এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

আরও পড়ুন: মানহানি মামলায় মালয়েশিয়ার আদালতে অভিবাসী কর্মী অ্যান্ডি হলকে ৫ লাখ রিঙ্গিত জরিমানা

বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা সাময়িকী 'নেচার ন্যানোটেকনোলজি'-তে প্রকাশিত এই উদ্ভাবনী কার্যক্রমটির যৌথ নেতৃত্বে ছিলেন নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও প্রখ্যাত অধ্যাপক মার্ক হারসাম এবং ম্যাককোরমিক স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিনোদ কে. সাংওয়ান। নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং বা মস্তিষ্কের ধাঁচে প্রসেসর নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথাগত শক্ত সিলিকন ভিত্তিক চিপের বিকল্প হিসেবে তাঁরা উন্নত ন্যানো-ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহারের ওপর জোর দেন। গবেষক দলটি এই বিশেষ ডিভাইসটি তৈরিতে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন মলিবডেনাম ডাইসালফাইড এবং অতি-পরিবাহী গ্রাফিন। বিশেষ অ্যারোসল জেট প্রিন্টিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পলিমার স্তরের ওপর ন্যানো-কালি ব্যবহার করে অত্যন্ত নমনীয়ভাবে এই কৃত্রিম নিউরন মুদ্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুন: শপিংমল ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নতুন সরকারি নির্দেশনা

প্রযুক্তিটির সফলতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল ইলেকট্রনিক কালির ভেতরে অবস্থিত 'স্ট্যাবিলাইজিং পলিমার' নিয়ন্ত্রণের উদ্ভাবনী কৌশলে। এতদিন ধরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে এই পলিমারকে একটি প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা করে পুরোপুরি পুড়িয়ে ফেলা হতো। কিন্তু নর্থওয়েস্টার্নের বৈজ্ঞানিক দলটি উক্ত পলিমারকে আংশিক ভাঙনের সুযোগ দেন। এর ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় ডিভাইসের ভেতরে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রাকৃতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পথ তৈরি হয়, যা অবিকল মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের জটিল ফায়ারিং ও স্পাইকিং ছন্দের প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম। মানুষের মস্তিষ্কের প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন যেভাবে ক্ষণস্থায়ী বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান করে নিজেদের মধ্যে মেধা ও স্মৃতির সঞ্চার ঘটায়, ঠিক একই ছন্দে সংকেত প্রদানে সমর্থ হয়েছে এই মুদ্রিত সার্কিট।

গবেষণাগারে টিস্যু পরীক্ষার সময় ইঁদুরের সেরিবেলাম অংশ থেকে সংগৃহীত তাজা বায়োলজিক্যাল নিউরনের সমুখে এই কৃত্রিম ডিভাইসের সংকেত প্রয়োগ করা হলে স্নায়ুকোষগুলো সংকেতটিকে অন্য এক জীবন্ত নিউরনেরই বার্তা হিসেবে গ্রহণ করে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। চিকিৎসা ক্ষেত্রের বাইরেও এই আবিষ্কারের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। বর্তমান যুগের বৃহদাকার এআই মডেল ও ডেটা সেন্টারগুলো চালাতে যে বিপুল পরিমাণের বৈদ্যুতিক শক্তির অপচয় ঘটে, এই নিউরোমর্ফিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মানুষের স্বাভাবিক প্রসেসিং শক্তির মতো মাত্র ২০ ওয়াট সীমানার কাছাকাছি কম শক্তিতেই জটিলতর এআই মডেল পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এটি এখনো প্রাথমিক পরীক্ষাগার পর্যায়ে রয়েছে এবং মানবদেহে পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের পূর্বে এর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে আরও ব্যাপক পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সূত্র: নেচার ন্যানোটেকনোলজি এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন