প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুমিল্লা জেলা বরাবরই মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ সিন্ডিকেটের ট্রানজিট রুট হিসেবে অপরাধীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়ে থাকে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন অভিনব কৌশলে প্রবেশ করা সর্বনাশা মরনাস্ত্র ইয়াবাসহ নানা প্রকার নিষিদ্ধ মাদকের বড় বড় চালান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। উঠতি বয়সী তরুণ সমাজ ও যুবশক্তিকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার এই জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল এমন এক বিশাল ও চাঞ্চল্যকর মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেছে, যা পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত পটভূমি এবং পুলিশ বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের সোমবারের এক বিশেষ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে কুমিল্লা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-র এই সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট ও গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ আভিযানিক দল আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল যে, দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ মাদক কারবারি চক্র অত্যন্ত দামি বিলাসবহুল যানের ভেতর কোটি কোটি টাকার ইয়াবার চালান লুকিয়ে রাজধানী ঢাকার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই গোপন খবরের সত্যতা নিশ্চিত করার পর ডিবির দলটি মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সন্দেহভাজন একটি অত্যাধুনিক সাদা রঙের প্রাডো জিপ গাড়িকে সুকৌশলে অনুসরণ করতে শুরু করে। দীর্ঘপথ নিখুঁতভাবে তাড়া করার পর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকা থেকে গাড়িটিকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে কোতোয়ালী থানাধীন জাগুরঝুলি এলাকার কৃষ্ণনগর নামক স্থানে পৌঁছামাত্র অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে ঘেরাও করে আটক করা হয়।
প্রাথমিক আটকের পর অত্যন্ত কঠোর ও নিবিড় নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিলাসবহুল ওই প্রাডো গাড়িটি তল্লাশি করা হয় এবং গাড়ির ভেতরের বিভিন্ন গোপনীয় অংশ, সিটের নিচে ও সুকৌশলে তৈরি করা বিশেষ কাঠামোর ভেতর থেকে স্কচটেপে মুড়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখা মাদকের বিশাল চালানের সন্ধান পাওয়া যায়। পুলিশ সদস্যরা একে একে স্কচটেপ মোড়ানো প্যাকেটগুলো বাইরে বের করে আনেন এবং গণনা করে দেখতে পান যে সেখানে মোট ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) পিস অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট মজুত করা রয়েছে। উদ্ধারকৃত এই বিপুল পরিমাণ তিন লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটের বর্তমান বাজারমূল্য যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, এর আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা, যা সাম্প্রতিককালের উদ্ধার হওয়া মাদকের চালানের মধ্যে অন্যতম বড় একটি চালান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার এই ভয়ংকর মাদকের চালানটি নিরাপদে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যেই এই বিলাসবহুল প্রাডো গাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
মাদক উদ্ধারের এই রোমহর্ষক অভিযানের সময় গাড়ির ভেতর চালক ও সহযোগীসহ মোট দুই জন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয় ডিবি পুলিশ, যাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। একই সাথে মাদক চোরাচালানের কাজে সরাসরি ব্যবহৃত হওয়া ওই বিলাসবহুল সাদা রঙের প্রাডো গাড়িটিও আলামত হিসেবে জব্দ করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। পরবর্তীতে ডিবির কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আটককৃতদের দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে। জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে যে তাদের মূল বাড়ি দূরবর্তী কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত চকরিয়া থানা এলাকায় এবং তারা মূলত ওই অঞ্চলের একটি সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। তারা বিগত কয়েক দিন ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে কক্সবাজার থেকে ইয়াবার এই বিশাল চালানটি সংগ্রহ করে প্রথমে চট্টগ্রাম এলাকায় এসে কিছু সময় অবস্থান করেছিল এবং পরবর্তীতে সোমবার সকালে পুনরায় সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদক সরবরাহ করে আসছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। আটককৃত এই দুই মাদক কারবারির বিরুদ্ধে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধারায় নিয়মিত মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মহোদয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্যের যেকোনো ধরনের চোরাচালান, পরিবহন, পাইকারি সরবরাহ ও খুচরা বিক্রির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অবিরাম গতিতে অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, কুমিল্লা ডিবির এই দুঃসাহসিক ও সফল অভিযান প্রমাণ করে যে অপরাধীরা যতই দামি গাড়ি বা আধুনিক কৌশল ব্যবহার করুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও পেশাদারিত্বের সামনে তাদের কোনো অপকৌশলই টিকবে না। ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ পিস ইয়াবাসহ প্রাডো গাড়ি আটক এবং দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপতারের এই ঘটনা দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করার লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং কুমিল্লার মাটি থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে। সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
সূত্র: কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) প্রেস নোট ও পুলিশ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।