প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ততম এবং প্রধান মহাসড়কগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি প্রায়শই চালক ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য এক চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার সাথে উত্তরের বিভিন্ন জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের প্রধান পথ হিসেবে সিরাজগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া মহাসড়কগুলোতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বেপরোয়া গতিতে ভারী মালবাহী ট্রাক, কভার্ডভ্যান ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে থাকে। যথাযথ ট্রাফিক নিয়মনীতির অভাব, চালকদের অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের প্রবণতার কারণে এই সমস্ত ব্যস্ত সড়কে প্রায়ই অত্যন্ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, যা অসংখ্য তাজা প্রাণ কেড়ে নেয় এবং পরিবারগুলোকে নিঃস্বার্থ করে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরাজগঞ্জ জেলার সলঙ্গা থানা এলাকার অন্তর্গত ব্যস্ততম মহাসড়কে এমনই এক হৃদয়বিদারক এবং বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা স্থানীয় জনজীবনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও জনরোষের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের অত্যন্ত শোকাবহ দিনটি অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের মঙ্গলবারের ভোরের প্রাক্কালে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক ভোররাত চারটা বাজছিল এবং চারপাশ তখন তীব্র অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন বা নিস্তব্ধ ছিল, ঠিক তখনই বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের সলঙ্গা থানাধীন পাটধারী বাজার সংলগ্ন এলাকার ওপর দিয়ে একটি দ্রুতগামী পিকআপ ভ্যান ও বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ভারী ট্রাকের মুখোমুখি বা সজোরে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের শব্দ এতটাই বিকট ছিল যে আশপাশের ঘুমন্ত মানুষগুলোর টনক নড়ে ওঠে এবং তারা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসেন। ভারী ট্রাকের সাথে সরাসরি ধাক্কা লাগার ফলে পিকআপ ভ্যানের সামনের অংশ সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে যায় এবং গাড়িটির ভেতরে থাকা চালক গুরুতর জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই অত্যন্ত মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন, যা উপস্থিত লোকজনকে দারুণভাবে শোকাহত করে তোলে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় এলাকাবাসী ও পথচারীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে এসে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া পিকআপের কেবিন থেকে চালকের মৃতদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালান, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে নিহত চালকের নাম, ঠিকানা বা কোনো ধরনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, কারণ তাদের অভিযোগ অনুযায়ী দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানাসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে একাধিকবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অবহিত করা সত্ত্বেও পুলিশ নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনে এই চরম অবহেলা এবং দেরিতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই স্থানীয় শত শত মানুষ একত্রিত হয়ে নিহত চালকের মরদেহটি মহাসড়কের মাঝখানে সসম্মানে রেখে সড়ক অবরোধ করে বসেন। মানুষের এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের ফলে মুহূর্তের মধ্যে বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি আটকে পড়ে এবং দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর যানজটের সৃষ্টি হয়।
মহাসড়ক অবরোধের তীব্রতা বাড়তে থাকায় উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানী ঢাকার এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটগুলোর যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজটে আটকে থেকে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তোলে। স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা এ সময় হাইওয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তা ও বিলম্বে সাড়ার দেওয়ার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন এবং দাবি জানান যে, মহাসড়কে নিয়মিত পুলিশি টহল ও ট্রাফিক নজরদারি জোরদার না করার কারণেই আজকের এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এদিকে, মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে সলঙ্গা থানা পুলিশ ও হাইওয়ে থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার জন্য নানা ধরনের মধ্যস্থতা ও আশ্বাসের প্রক্রিয়া শুরু করেন, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে যান চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন: বিজেপি নেতা বিকাশ কুমার ধর হত্যা মামলা: ৬ জন গ্রেপ্তার ও দুই মূল অভিযুক্ত পুলিশ রিমান্ডে
অন্যদিকে, স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে আনা দেরিতে পৌঁছানোর এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার সানোয়ার হোসেন সংবাদমাধ্যমকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দাপ্তরিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই হাইওয়ে থানার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ করা হয়নি, বরং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পুলিশ ফোর্স প্রেরণ করা হয়েছে। তবে কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলা এবং দূরবর্তী অবস্থানের কারণে পৌঁছাতে সামান্য সময় লাগতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত করেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ জনতা ও পুলিশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল এবং মহাসড়কের অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, যাতে আটকে থাকা হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন পুনরায় স্বাভাবিক গতিতে নিজ গন্তব্যে ফিরে যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সলঙ্গায় ট্রাক ও পিকআপের এই সংঘর্ষে চালকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং পরবর্তীতে পুলিশের বিলম্বিত উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে মহাসড়ক অবরোধের এই ঘটনাটি আমাদের দেশের সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নাজুক অবস্থাকেই পুনরায় উন্মোচন করেছে। হাইওয়ে পুলিশের দ্রুত তৎপরতা এবং চালকদের একটু সচেতনতা বহু অমূল্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে, যা আজকের এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা আশা করি, নিহত চালকের পরিচয় দ্রুত সনাক্ত করে তাঁর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং মহাসড়কে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে প্রশাসন আরও কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আগামীর মূল লক্ষ্য।
সূত্র: সলঙ্গা থানা ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে পুলিশ প্রেস নোট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।