গোপালগঞ্জে ৬৪ হাজার ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জে ৬৪ হাজার ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত গোপালগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ জনপদে মাদকদ্রব্যের অবৈধ বিস্তার রোধ করা, উঠতি বয়সী যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সমূলে উৎপাটন করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা অত্যন্ত তৎপর, কঠোর ও সজাগ রয়েছে. একটি আধুনিক ও শান্তিময় জনপদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সুসংহত রাখতে এবং মাদকের নিরাপদ ও গোপন আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিরতিতে বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করা একটি অপরিহার্য জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়. গোপালগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি পুলিশের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এমনই একটি অত্যন্ত সফল, সুদূরপ্রসারী ও ধারাবাহিক বিশেষ আভিযানিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরো জেলা এলাকায় মাদক দমনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা স্থানীয় নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে. মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে মাঠপর্যায়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যি প্রশংসনীয় এবং সমাজ থেকে অপরাধ দূর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে.

আরও পড়ুন: পাবনায় নারী পুলিশ সদস্যদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী ও সনদ বিতরণ

ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত দাপ্তরিক ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বুধবার ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে এই বিশেষ ও সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল. গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার অধীনস্থ অত্যন্ত পরিচিত ও জনবহুল এলাকা হিসেবে খ্যাত নবীনবাগ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা এই অবৈধ কারবারের কারণে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন. গোয়েন্দা বিভাগের কাছে থাকা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে জেলা গোয়েন্দা শাখার চৌকস দল ওই এলাকার দিকে নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করে এবং একটি বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে সন্দেহভাজন যানবাহন তল্লাশির প্রস্তুতি গ্রহণ করে. সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ টিম অত্যন্ত সুকৌশলে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নেয় এবং অপরাধীদের হাতেনাতে ধরে ফেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে.

উক্ত সফল অভিযান পরিচালনার নেপথ্য কৌশল ও ঘটনার বিবরণ সম্পর্কে পুলিশ বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায় যে, নির্ধারিত ওই দিন ভোরে স্থানীয় এলজিইডি অফিসের সামনে প্রধান সড়কের ওপর একটি বিশেষ চেকপোস্ট পরিচালনা করছিল ডিবি পুলিশের চৌকস দলটি. সেই মুহূর্তে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসা একটি বিলাসবহুল ও সন্দেহজনক নোহা গাড়ি চেকপোস্টের সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গাড়িটিকে থামার নির্দেশ দেয় এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে. অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে গাড়িটির ভেতর তল্লাশি চালানো শুরু হলে এর আসল রহস্য বেরিয়ে আসে এবং বড় ধরনের মাদকের চালান ধরা পড়ে. আটকের সময় ওই দ্রুতগতির নোহা গাড়ির ভেতরে অবস্থান করা মো. উজ্জ্বল মোল্লা (৩৮) এবং মো. রিফাত মোল্লা ওরফে ওয়াসিম (২২) নামের দুই তরুণ মাদক কারবারিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়.

আরও পড়ুন: অভয়নগরে ৮০ পিস ইয়াবাসহ চিহ্নিত নারী মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

অভিযান চলাকালীন সময়ে ধৃত আসামিদের দখল থেকে উদ্ধারকৃত মালামাল ও অবৈধ সম্পদের বিবরণ দিতে গিয়ে প্রশাসন জানিয়েছে যে, অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় সর্বমোট ৬৪ হাজার ১২৩ পিস অবৈধ মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে, যা বর্তমান প্রজন্মের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করার জন্য অত্যন্ত ভয়ানক এক চালন ছিল. পুলিশ জানিয়েছে যে উদ্ধারকৃত এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেটের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ টাকা, যা জেলার ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি মাদকের চালান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে. শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটই নয়, এর পাশাপাশি মাদক ব্যবসা পরিচালনা ও নতুন করে বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যে রাখা ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫ টাকা নগদ অর্থ এবং অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত প্রায় ৪৪ লাখ টাকা মূল্যের বহুমূল্যবান ওই নোহা গাড়িটিও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে.

পরবর্তীতে এই সফল অভিযান ও বিশাল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর জন্য বুধবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়. আয়োজিত উক্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে গোপালগঞ্জের সম্মানিত পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ নিজে উপস্থিত থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন এবং অভিযানের নেপথ্য কাহিনী বর্ণনা করেন. পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, গোপালগঞ্জ জেলাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, অপরাধহীন এবং শান্তিময় জনপদে রূপান্তর করার জন্য পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর. তিনি মাদকের সাথে জড়িত কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন এবং এই মহৎ ও সামাজিক কাজে সফল হতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা, সচেতনতা ও তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানান.

পরিশেষে বলা যায়, গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ এলাকায় ডিবি পুলিশের অভিযানে ৬৪ হাজার ১২৩ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারির গ্রেপ্তারের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে অপরাধীদের যতই শক্তিশালী সিন্ডিকেট হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে তারা আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না. সমাজের শেকড় থেকে মাদক নামক এই মারাত্মক সামাজিক ক্যানসার নির্মূল করতে পুলিশ প্রশাসনের এই ধরনের নিয়মিত ও সাহসী অভিযান অত্যন্ত অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে চলেছে. আমরা আশা করি, বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে এই অপরাধীদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং গোপালগঞ্জ জেলা একটি নিরাপদ জনপদে পরিণত হবে. সবার সম্মিলিত সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত জাতি গঠনের প্রধান শর্ত হিসেবে সবসময় কাজ করবে.

সূত্র: জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) গোপালগঞ্জ ও পুলিশ সুপার কার্যালয় প্রেস নোট.

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন