প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়ার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় ছিল ৩ আগস্টের বিকেল। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ বেদিতে সেদিন আছড়ে পড়েছিল আপামর ছাত্র-জনতার জনসমুদ্র। হাজার হাজার মানুষের চোখ আবদ্ধ ছিল একটি মাত্র কেন্দ্রীয় মঞ্চে। সমগ্র দেশের কোটি মানুষ চরম উদ্বেগ ও টানটান উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সেই ক্ষণটির জন্য, যেখান থেকে আন্দোলনের পরবর্তী চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ও বহু প্রতীক্ষিত ‘এক দফা’ দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হওয়ার কথা ছিল।
আরও পড়ুন: নাসিরনগরে মাদকের টাকার জন্য মাকে নির্যাতন, ২ ছেলেকে কারাদণ্ড দিল ভ্রাম্যমাণ আদালত
বিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে লাল-সবুজের প্রদীপ্ত পতাকায় মাথা বেঁধে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। মাথায় শক্ত করে বাঁধা জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ ফিতাটি উপস্থিত জনতার চোখে ছিল কেবল একটি প্রতীকী অনুষঙ্গ নয়, বরং যেন আত্মত্যাগের সংকল্পে দৃঢ় এক কাফনের কাপড়। আন্দোলনরত ছাত্রনেতা ও উপস্থিত জনতার প্রতিটি রক্তবিন্দু জানত যে, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এই মহতী লড়াইয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই; ব্যর্থতার অর্থ ছিল আরও ভয়াবহ দমনপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন।
অবশেষে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ অধীর জনতাকে প্রকম্পিত করে উচ্চারিত হয় সেই ঐতিহাসিক চূড়ান্ত ঘোষণা। নাহিদ ইসলাম দৃঢ় কণ্ঠে জাতির উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন এক দফার মূল বার্তা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান ও সমাজে চিরস্থায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতা এক দফার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই ঘোষণার মূল কথা ছিল—তৎকালীন শাসকদলের ক্ষমতায় টিকে থাকার ন্যূনতম কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক বৈধতা আর অবশিষ্ট নেই এবং তাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।
ঐতিহাসিক সেই মহাতেজস্বী বার্তা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণসহ চারপাশ বজ্রধ্বনিতুল্য মুহুর্মুহু করতালিতে গর্জে ওঠে। এক দফার ডাক কেবল ঢাকা কিংবা শহীদ মিনারের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি, মুহূর্তে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের অগণিত অলিগলিতে। বিশাল জনসমুদ্রের পটে নেপথ্যে সুর ভেসে আসছিল—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে—আমার জন্মভূমি’। সেই সুমধুর দেশাত্মবোধক গান প্রাঙ্গণে উপস্থিত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের হৃদয়কে প্রবল আবেগ ও দেশপ্রেমে উদ্বেলিত করে তোলে।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীতে ৯৯৯-এ কলে সাড় সাড়ে ১১ কেজি গাঁজাসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেফতার
ঐতিহাসিক ৩ আগস্টের সেই স্মরণীয় ক্ষণটির সর্বাপেক্ষা বড় পরাক্রমশালী শক্তি ছিল ধর্ম, বর্ণ, বয়স ও পেশার ঊর্ধ্বে উঠে গণমানুষের অভাবনীয় রাজনৈতিক একাত্মতা। সাধারণ শিক্ষার্থী, কলকারখানার শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসা কর্মী, গৃহিণী ও চিন্তিত অভিভাবকেরা নিজ নিজ পেশাগত পরিচয় ভুলে দাঁড়িয়েছিলেন এক ও অভিন্ন পতাকার তলে। সেদিন রাজনৈতিক ও সামাজিক সকল বিভেদ মুছে দিয়ে একটাই পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠেছিল, আর তা হলো—বাঙালি ও বাংলাদেশ। গণআন্দোলনের এই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিকেলটি ইতিহাসকে শুধুই কোনো রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের পরম মুক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগরণের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।