প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
পশ্চিমাপন্থী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বাণিজ্যিক অবরোধের মুখে নিজেদের জাতীয় অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী ও সুরক্ষিত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যে এক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট ২০২৬) দেশটির বাৎসরিক 'সরকার সপ্তাহ' উদযাপন উপলক্ষে প্রদত্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তায় দেশটির সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন রূপ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার স্বাভাবিক করার স্বার্থে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন মুদ্রা ডলারের নির্ভরতা থেকে ধাপে ধাপে বের হয়ে আসার আহ্বান ব্যক্ত করেন।
আরও পড়ুন: কাপ্তাইয়ের সীতাপাহাড়ে পথ হারানো ৪ পর্যটক উদ্ধার
ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায় এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনাবিদদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এই বার্তায় মোজতবা খামেনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশকে যেকোনো অর্থনৈতিক আঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে 'প্রতিরোধী অর্থনীতি' বা রেজিলিয়েন্ট ইকোনমি-কে সকল সরকারি নীতির মূলকেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে। বিদেশি পণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত সয়লাব ঠেকানো এবং অভ্যন্তরীণ শিল্প ও কৃষি খাতকে আত্মনির্ভরশীল করার মূল মন্ত্রই হলো এই স্বনির্ভর মডেল। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, স্বনির্ভরতার অর্থ বৈশ্বিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। যদি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য দেশীয় উৎপাদন অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বিচক্ষণতার সাথে বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির নীতি গ্রহণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রগতির ধারাকে ত্বরান্বিত করার জন্য ঐতিহ্যগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। খামেনি জোর দিয়ে বলেন, একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নতুন প্রযুক্তি, আইটি খাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নতুন উদ্ভাবনগুলোকে দেশের প্রতিটি উৎপাদনশীল শিল্পে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন দেশীয় পণ্যের মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হবে, অন্যদিকে দেশের তরুণ ও বিজ্ঞানীদের মেধাকে সরাসরি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাজে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তিভিত্তিক এই মডেল ইরানকে বহির্বিশ্বের যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ বা একক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্বকীয় গতিতে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা জোগাবে।
আরও পড়ুন: আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, পেশাদারিত্বের তাগিদ আইনমন্ত্রীর
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ইরানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চেপে ধরার জন্য যে নতুন ধরণের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেটির প্রেক্ষাপটেই দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এই নীতিগত দিকনির্দেশনা এলো। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও ইরান তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে নিজস্ব ও স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনার যে বৈশ্বিক প্রবণতা শুরু হয়েছে, ইরান সেটিকে আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আমেরিকা যে আধিপত্য বজায় রেখেছে, সেটিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অর্থনৈতিক মুক্তির এই কঠিন সংগ্রামে জয়ী হওয়ার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সর্বস্তরের জনগণের ইস্পাতদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে সতর্ক করেন এই শীর্ষ নেতা। তিনি মন্তব্য করেন যে, শত্রুপক্ষ যখন অর্থনৈতিকভাবে কোনো জাতিকে দুর্বল করার চেষ্টা চালায়, তখন সামাজিক বিভাজন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করাই তাদের মূল কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। তাই দেশের ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক নির্বিশেষে সকলকে সাথে নিয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। সকল অভ্যন্তরীণ দ্বিমত দূরে ঠেলে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালানোর ওপরই দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে বলে মনে করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই আহ্বান কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যকে টেক্কা দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি বিক্রি থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিটি পদক্ষেপে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার বাদ দেওয়ার যে বিশ্বব্যাপী ঢেউ উঠেছে, তেহরান তাতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে চায়। যদি সরকার সুপ্রিম লিডারের নির্দেশনা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের প্রভাব মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। একই সাথে স্বাবলম্বী অর্থনীতির এই নজির মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য মডেল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
সূত্র: ইরানি সংবাদ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।