প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউমার্কেট সংলগ্ন ব্যস্ততম এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক আবাসিক হোটেল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দুই বাংলায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার বিখ্যাত মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামক একটি আবাসিক হোটেলে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এই বর্বরোচিত ও আকস্মিক দুর্ঘটনায় মোট নয়জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যার মধ্যে সাতজনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক এবং বাকি দুজন ভারতীয় নাগরিক। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, ময়নাতদন্ত এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর আজ ২২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নিহতদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক সংবাদে নিহতদের পরিবার ও নিজ নিজ এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
ঘটনার পটভূমি পর্যালোচনা করে জানা যায় যে, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল পুরো এলাকা, ঠিক সেই মুহূর্তেই মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলটিতে আকস্মিক আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে লেলিহান শিখা এবং কুচকুচে কালো ধোঁয়া পুরো ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে হোটেলটির ভেতরে থাকা বোর্ডারদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও হাহাকার শুরু হয়। প্রাথমিক তদন্তে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, যে ভবনটিতে ‘শিখা ইন’ হোটেলটি পরিচালিত হচ্ছিল, সেটির পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ফায়ার লাইসেন্স পর্যন্ত ছিল না। সবচেয়ে বড় এবং অপরাধজনক ত্রুটি ছিল এই যে, হোটেলের জরুরি বহির্গমন বা ইমার্জেন্সি এক্সিট পথটি নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থায়ী দেয়াল তুলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে হোটেলের ভেতরে আটকা পড়া মানুষগুলো চরম বিপদের মুখে পড়েন এবং জীবনের তাগিদে বাইরে বের হওয়ার কোনো বিকল্প পথ খুঁজে না পেয়ে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে কয়জন বাংলাদেশি নাগরিক অকালে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মর্মান্তিক পরিণতি প্রতিটি মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার কৃতি সন্তান, বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর সহধর্মিণী, আদরের সন্তান এবং তাঁর শ্বশুরসহ একই পরিবারের মোট চারজন সদস্য মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এছাড়া ঢাকার সাভার এলাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবু এবং সাতক্ষীরা জেলার কৌতূহলী ও প্রবাসীর জীবন কাটানো এস এম আলিমুজ্জামানও এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। অপরদিকে, নিহত অপর বাংলাদেশি নাগরিক রেবতী সরকারের মরদেহ ভারতে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় নিয়মকানুন সম্পন্ন করার পর কলকাতার স্থানীয় একটি শ্মশানে যথাযথ মর্যাদায় সৎকার করা হয়েছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তাদের স্বজনরা, আর আজ মরদেহগুলো দেশে পৌঁছানোর পর সেই কান্নার রোল আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: গোপালগঞ্জে ৬৪ হাজার ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলো। কলকাতা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে এবং দায়িত্বে অবহেলা ও চরম অনিয়মের অভিযোগে হোটেলের পরিচালনা পর্ষদের তিনজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বা দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা হোটেলের মূল মালিক এখনও পলাতক রয়েছে এবং তাকে গ্রেফতারে কলকাতা পুলিশের বিশেষ দল জোরদার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে, সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কলকাতা প্রশাসন নিউমার্কেট এলাকার ওই সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত প্রায় অর্ধশতাধিক নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ আবাসিক হোটেল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। যেসব হোটেলের সঠিক ফায়ার লাইসেন্স এবং জরুরি বহির্গমন পথ নেই, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আজ সকালে বেনাপোল এবং ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ছয় বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর খবর পাওয়ার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় এবং নিহতের নিজ নিজ বাড়িতে শোকাবহ ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কলকাতা অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি সাধারণ অসচেতনতা এবং হোটেল কর্তৃপক্ষের লোভের বলি হতে হলো এতগুলো তাজা প্রাণকে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে দুই দেশের সীমান্ত ও পর্যটন এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর কড়া নজরদারি রাখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
পরিশেষে বলা যায় যে, কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বহীনতা এবং নিয়মের তোয়াক্কা না করার এক ভয়ংকর পরিণতি। ঝরে যাওয়া এই প্রাণগুলো আর কখনোই ফিরে আসবে না, তবে এই ঘটনার মাধ্যমে হোটেল ব্যবসা ও পর্যটন খাতের নিরাপত্তা নিয়ে যে কঠিন বার্তাটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদের মধ্য দিয়ে যখন নিথর দেহগুলো নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসছে, তখন গোটা দেশবাসী সেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করছে।
প্রতিবেদনের সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।