লোহাগাড়ায় অজগর উদ্ধারের পর বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

লোহাগাড়ায় অজগর উদ্ধারের পর বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় একটি বসতবাড়ির উঁচু নারকেল গাছ থেকে একটি বিশাল আকারের অজগর সাপ উদ্ধার করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বন বিভাগের ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। অমানবিক হামলা থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষায় উদ্ধারকারী তরুণদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রশংসিত হলেও, উদ্ধারের পর বন বিভাগের অহেতুক প্রশ্নের মুখে পড়তে হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বন্যপ্রাণী প্রেমীদের মাঝে।

আরও পড়ুন: তদবির কালচার বন্ধের কঠোর বার্তা দিলেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের ইয়াছিন পাড়া ও আমতলী এলাকার একটি স্থানীয় বসতবাড়ির আঙিনায় থাকা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এক নারকেল গাছের ওপর বিশালাকার অজগর সাপটি দেখতে পান গৃহস্থ ও পথচারীরা। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের পাশাপাশি আতঙ্ক দেখা দেয়। আতঙ্কিত এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে সাপটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। এই খবর জানতে পেরে স্থানীয় এক সচেতন ব্যক্তি ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেইক রেস্কিউ টিম ইন বাংলাদেশ (WSRTBD)-এর সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত সাপটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আকুতি জানান।

সংগঠনটি সূত্রে জানা গেছে, লোহাগাড়া বা প্রতিবেশী সাতকানিয়া এলাকায় তাদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী রেস্কিউয়ার বা উদ্ধারকারী না থাকায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টেলিফোনে স্থানীদের বোঝানো হয় যে অজগর একটি সম্পূর্ণ বিষহীন ও ক্ষতিকর নয় এমন প্রাণী, তাই এটিকে না মেরে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অন্য দূরবর্তী উপজেলা থেকে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেইক রেস্কিউ টিম ইন বাংলাদেশ (WSRTBD)-এর দুই সাহসী ও প্রশিক্ষিত তরুণ রেস্কিউয়ার সজীব মজুমদার ও আবদুল্লাহ আল সাবিত দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান। প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চরম ঝুঁকি নিয়ে ৩০ ফুট উঁচু নারকেল গাছ থেকে তারা নিরাপদে অজগরটি উদ্ধার করতে সমর্থ হন।

তবে নাটకీయ ঘটনা ঘটে সাপ উদ্ধারের ঠিক পরেই। উদ্ধার অভিযান সফলভাবে শেষ হওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয় বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—কেন বন বিভাগকে না জানিয়ে সাপ উদ্ধার করা হলো, কেন উদ্ধারকৃত সাপটি তাদের কাছে তৎক্ষণাৎ সমর্পণ করা হয়নি ইত্যাদি। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় যে, চুনতি অভয়ারণ্য রেঞ্জের কর্মকর্তারা পরদিন এসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধারকৃত সাপের হস্তান্তর গ্রহণ করবেন। উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে করতে সন্ধ্যা নেমে যাওয়ায় সেদিন আর সাপটিকে গহীন বনে অবমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবী রেস্কিউয়ার ও পরিবেশবাদীরা বেশ কিছু যৌক্তিক ও নীতিগত প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাপটি যখন লোকালয়ের নারকেল গাছে অবস্থান করছিল এবং ঘটনাস্থল থেকে বন বিভাগের স্থানীয় কার্যালয় মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ মিটারের দূরত্বে ছিল, তখন সারাদিন বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন? সারাদিন নিষ্ক্রিয় থেকে স্বেচ্ছাসেবীদের প্রচেষ্টায় উদ্ধার সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেন তাদের এই অতি-তৎপরতা?

আরও পড়ুন: শ্রীনগরে মাদ্রাসায় শি/শু নি/র্যা তন: পড়া না পারায় ছাত্রী/র মে/রুদণ্ড ভাঙার অভিযোগ

পরিবেশপ্রেমীরা জানান, বন ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইনত সরকারি বন বিভাগের মূল দায়িত্ব। স্বেচ্ছাসেবীরা কোনো সরকারি সুবিধা না নিয়ে কেবলমাত্র জীববৈচিত্র্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা, নিজেদের সময়, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করে থাকেন। অথচ বিরল বা বিপন্ন প্রজাতির অজগর উদ্ধারের পর কেবল সুনাম অর্জনের জন্য যদি বন বিভাগ এমন অনভিপ্রেত মানসিকতা প্রদর্শন করে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। বারবার এ জাতীয় অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে মাঠপর্যায়ের তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। সুশীল মহলের মতে, বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে বন বিভাগ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, চমৎকার সমন্বয় ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন