প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নির্মাণাধীন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে সমন্বিত ও ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। অনিয়মিত ও আইনবহির্ভূতভাবে অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পরিচালিত এই বিশেষ এনফোর্সমেন্ট অভিযানে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫২৮ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আজ ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার মালয়েশিয়া অভিবাসন বিভাগের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই বৃহৎ যৌথ অভিযানের বিশদ বিবরণ গণমাধ্যমকে সুনির্দিষ্টভাবে অবহিত করা হয়েছে। দেশটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাত কেন্দ্রিক এই অভিযানে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী গ্রেফতারের ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়াসহ সার্বিক আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ব্যাপক তোলপাড় ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: আমেরিকা ও ইসরায়েলকে ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, সংঘাতের শঙ্কা
অফিসিয়াল নথিপত্রের বরাতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চলতি সপ্তাহের গত ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে মালয়েশিয়ার প্রধান প্রধান অঙ্গরাজ্যের নির্মাণ ক্ষেত্রগুলোতে একযোগে এই সাঁড়াশি আইন প্রয়োগকারী অভিযান শুরু করা হয়। টানা কয়েক দিনব্যাপী পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ভিসার মেয়াদের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা এবং অনুমোদিত কর্মক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে কাজ করার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের হেফাজতে নেওয়া হয়। প্রশাসনিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আটককৃত মোট ৫২৮ জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে ৪৫০ জন পুরুষ এবং ৭৮ জন নারী কর্মী রয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্যমতে, আটককৃতদের মধ্যে একাধিক দেশের অধিবাসী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, চীন এবং আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোর নাগরিকেরা অন্তর্ভুক্ত আছেন।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের প্রয়োগকারী ও এনফোর্সমেন্ট শাখার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং পরিচালক বাসরি ওথমান গণমাধ্যমের কাছে সার্বিক অভিযানের মূল তথ্য তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, এই বিশেষ চিরুনি অভিযান চলাকালে বিভিন্ন নির্মাণ সাইট থেকে সর্বমোট ৬৭৮ জন ব্যক্তির পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রাথমিক তল্লাশি শেষে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়ায় বিপুল সংখ্যক বিদেশি নাগরিককে আটক করা সম্ভব হয়। এই বিশেষ তৎপরতার অংশ হিসেবে শুধু দেশটির সুপরিচিত প্রশাসনিক কেন্দ্র পুত্রজায়ার একটি নির্দিষ্ট অবকাঠামোগত সাইটে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে ২৮ জন পুরুষ এবং ৩ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে হোটেল বারে সংঘাত, হামলাকারীসহ ২ যুবকের প্রাণহানি
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভিবাসন দপ্তরের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় অধিবাসীদের প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই মূলত এই বৃহৎ অভিযানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুমোদনহীন অভিবাসীদের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি এবং অবৈধভাবে কাজ করার ফলে সৃষ্টি হওয়া নিরাপত্তার ঝুঁকি ও উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে প্রশাসন এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই যৌথ অভিযানে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ, রাজকীয় মালয়েশিয়া পুলিশ (আরএমপি), জাতীয় নিবন্ধন বিভাগ এবং জাতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। এই বিশাল কার্যক্রমে বিভিন্ন দপ্তরের ৪১৪ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সদস্য সরাসরি অভিযানে অংশ নেন।
মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ অভিবাসন রোধকল্পে শূন্য সহনশীলতা নীতি বলবৎ করা হয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ ও শিল্প খাতে অনুমোদনহীন বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সেদেশের সরকার। দেশটির আইনি কাঠামোর আওতায় বৈধ ভিসা ও উপযুক্ত ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করা যেমন প্রবাসীদের জন্য গুরুতর অপরাধ, তেমনি অনুমতি ছাড়া বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধেও মোটা অংকের জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থার কঠোর বিধান রয়েছে। বর্তমানে আটককৃত সকল বিদেশিকে পরবর্তী আইনি প্রসেসিং, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য নির্ধারিত অভিবাসন ডিটেনশন ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ধৃতদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশী প্রবাসী হওয়ায় প্রবাসী কমিউনিটি এবং তাদের স্বজনদের মাঝে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিভিন্ন প্রবাসী সামাজিক সংগঠনসমূহ সাধারণ কর্মী ও শ্রমজীবীদের উদ্দেশ্যে সবসময় বৈধ কাগজপত্র ও পাসপোর্ট সাথে রাখা এবং ভিসা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও অবৈধ অভিবাসন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী দিনগুলোতেও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে এই ধরনের ঝটিকা অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক ডেস্ক ও মালয়েশিয়া অভিবাসন বিভাগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।