মেহেরপুরে গভীর রাতে প্রেমিকা ও তার বাবা-মাকে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় যুবক আটক

মেহেরপুরে গভীর রাতে প্রেমিকা ও তার বাবা-মাকে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় যুবক আটক
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলা পারিবারিক কলহ এবং প্রেমঘটিত সম্পর্কের চরম অবনতির ফলে উদ্ভূত নৃশংস অপরাধমূলক ঘটনাগুলো সমাজের বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। মানবসম্পর্কের এই অবক্ষয় এবং অন্ধ আক্রোশের বশে মানুষ কীভাবে পশুর চেয়েও নির্মম হয়ে উঠতে পারে, তার এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক নিদর্শন সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলা শহরে দেখতে পাওয়া গেছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং জিঘাংসার বশে সংঘটিত এই ধরনের নৃশংস অপরাধ কেবল নির্দিষ্ট একটি পরিবারকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর উৎকণ্ঠা ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নিরপরাধ মানুষের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর মতো ঘটনাগুলো কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ধরনের সহিংস অপরাধের নেপথ্য কারণগুলো উন্মোচন করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা সমাজ থেকে কখনো নির্মূল করা সম্ভব হবে না।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুশিয়ারি

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মারফত প্রাপ্ত অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে মেহেরপুর জেলার কেন্দ্রীয় শহর এলাকায়। নির্ধারিত সময় হিসেবে চলতি সপ্তাহের গত পঁচিশ আগস্ট তারিখের গভীর রাতে, যখন চারপাশের জনজীবন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমিয়েছিল, ঠিক তখনই এই অতর্কিত হামলাটি চালানো হয়। মেহেরপুর শহরের অত্যন্ত পরিচিত ও জনবহুল লর্ড মার্কেট এলাকার একটি নির্দিষ্ট আবাসিক ভবনে এই নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে, যা স্থানীয় লোকজনের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ওই এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত সেলিম হোসেনের নিজ বাসগৃহে গভীর রাতের নিরবতা ভেঙে এই ভয়াবহ আক্রমণটি চালানো হয়। অতর্কিত এই পৈশাচিক হামলায় ব্যবসায়ী সেলিম হোসেনের পুরো পরিবার মুহূর্তের মধ্যে এক রক্তক্ষয়হীন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পতিত হয়, যা প্রতিবেশীদের মধ্যেও মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশি তদন্তে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গভীর রাতের ওই সময়টাতে হামলাকারী শাওন নামের ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবসায়ী সেলিম হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করে। অভিযুক্ত ওই যুবক পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে অতর্কিতভাবে ঘরের ভেতরে থাকা ঘুমন্ত ও unsuspecting লোকজনের ওপর চড়াও হয় এবং এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করে। হামলাকারীর ধারালো অস্ত্রের লাগাতার ও নিষ্ঠুর কোপে ব্যবসায়ী সেলিম হোসেনের যুবতী কন্যা স্মৃতি আক্তার মারাত্মকভাবে জখম হন এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা করার সময় তার একটি হাত শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মেয়ের এমন আর্তচিৎকার শুনে তার বাবা সেলিম হোসেন এবং মা রেবেকা সুলতানা কামনা তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে এলে হামলাকারী তাদের ওপরও একইভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আক্রমণ চালায়। এই পৈশাচিক হামলায় পিতা সেলিম হোসেন এবং মাতা রেবেকা সুলতানা কামনা উভয়েই শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মকভাবে জখম হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন এবং চারপাশ রক্তে ভেসে যায়।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস ও লাখো মানুষের ঢল

হৃদয়বিদারক এই হামলার শব্দ এবং ভুক্তভোগীদের বাঁচাও বাঁচাও আর্তচিৎকার শুনতে পেয়ে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং চরম সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন। স্থানীয় জনতা ঘটনাস্থলে ছুটে আসার আগেই হামলাকারী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ঘেরাও হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। রাতের গভীরতার মধ্যেই মেহেরপুর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় রক্তে ভাসমান অবস্থায় আহত তিনজনকে উদ্ধার করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহতদের দ্রুত গতিতে মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে আহতদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে থাকায় এবং বিশেষ করে তরুণী স্মৃতির হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকরা তাদের কাউকেই সেখানে রাখ নিরাপদ মনে করেননি। পরবর্তী সময়ে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় এই তিনজনকেই দ্রুত ঢাকায় রেফার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের রাজধানী অভিমুখে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং পুলিশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই বর্বরোচিত হামলার আসল কারণ হিসেবে একটি পুরনো প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আইনি বিচ্ছেদের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে বলে জানা গেছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে অভিযুক্ত যুবক শাওনের সঙ্গে ভুক্তভোগী তরুণী স্মৃতি আক্তারের দীর্ঘ তিন থেকে চার বছর ধরে একটি প্রেমের সম্পর্ক চলমান ছিল বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সম্প্রতি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা জটিলতার জেরে তাদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও সেই সম্পর্ক খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। বিবাহের মাত্র এক থেকে দুই দিন পূর্বে তরুণী স্মৃতি আক্তার নিজেই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় বা পারিবারিকভাবে সেই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে ডিভোর্স বা তালাক প্রদান করেছিলেন। নিজের স্ত্রীর পক্ষ থেকে এই হঠাৎ ডিভোর্স পাওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত যুবক শাওন তীব্র মানসিক ক্ষোভ এবং প্রতিশোধপরায়ণ আক্রোশে অন্ধ হয়ে এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল বলে পুলিশ ধারণা করছে। প্রেমের চরম প্রত্যাখ্যান এবং আত্মসম্মানে লাগার ফলেই ওই যুবক গভীর রাতে ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর উদ্দেশ্যে প্রবাসীর বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।

ঘটনাটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আলামত সংগ্রহ করার কাজ পরিচালনা করেছেন। স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা এবং পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে অভিযুক্ত শাওনকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমানে সে থানা হেফাজতে কঠোর নিরাপত্তার মাঝে রয়েছে। এই নৃশংস ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা অপরাধীর সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে যে আটককৃত যুবকের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং পরবর্তী তদন্ত সাপেক্ষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। এই ধরনের ন্যাক্কারজনক অপরাধের পেছনে অন্য কোনো প্ররোচনা বা আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, সে বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, মেহেরপুর শহরে সংঘটিত এই প্রেমঘটিত নৃশংসতার ঘটনাটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং অসহিষ্ণুতার এক করুণ ও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন যতই থাকুক না কেন, আইন হাতে তুলে নিয়ে এভাবে একটি পুরো পরিবারকে চিরতরে পঙ্গু বা ধ্বংস করে দেওয়ার মানসিকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই বর্বরোচিত হামলায় আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি এবং অপরাধীর কঠোর বিচার দাবি করি, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর কেউ ঘটানোর সাহস না পায়। সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং পারিবারিক অনুশাসনের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েই কেবল এই ধরনের পৈশাচিক সহিংসতা রোধ করা সম্ভব—এটাই আজকের দিনের অত্যন্ত জরুরি দাবি।

প্রতিবেদনের সূত্র: মেহেরপুর থানা পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন