প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্ব রাজনীতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বৈচিত্র্যময় বৈচারিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবত ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির পক্ষে এক যুগান্তকারী ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্য প্রদান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে আয়োজিত এক বিশেষ আন্তর্জাতিক বহুধর্মীয় সংলাপে সরাসরি অংশগ্রহণ করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, কোনো হিন্দু ব্যক্তি যদি এমন সংকুচিত মনোভাব বা ভাবনা পোষণ করেন যে ভারতের ভূখণ্ডে কোনো মুসলিম নাগরিকের বসবাস করার অধিকার বা স্থান থাকা উচিত নয়, তবে সেই ব্যক্তি সনাতন ভাবধারার মূল বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হবেন এবং তিনি আর কখনোই নিজেকে প্রকৃত হিন্দু বলে দাবি করতে পারবেন না। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত এই বিশেষ ধর্মীয় সংলাপে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এই নীতিগত বক্তব্য তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে সুপারি গাছে না ওঠায় কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা
নিউইয়র্কের উক্ত আন্তঃধর্মীয় আন্তর্জাতিক সংলাপে অংশ নেওয়া বিশ্বের নানা প্রান্তের গবেষক ও ধর্মীয় প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আরএসএস-এর মূলনীতি এবং তাদের প্রস্তাবিত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ভাবনায় ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবস্থান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পেশ করা হয়। উক্ত সংবেদনশীল বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে মোহন ভগবত প্রাঞ্জল ভাষায় জানান যে, হিন্দু দর্শন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংকীর্ণতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি উদার ও সার্বজনীন জীবনধারা। তিনি উল্লেখ করেন, যদি কেউ নিজেকে সত্যিকার অর্থে হিন্দু আদর্শে বিশ্বাসী বলে মনে করেন, তবে তাকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে পৃথিবীর সকল ধর্ম চর্চার পথ শেষ পর্যন্ত পরম সত্য ও একই লক্ষ্য অভিমুখে ধাবিত হয়। প্রতিটি একক মানুষের নিজস্ব মর্যাদা ও অস্তিত্ব রয়েছে এবং সৃষ্টিকর্তার বিচারে মানুষের শ্রেণীতে শ্রেণীতে কোনো প্রকার বৈষম্য বা ভেদাভেদ থাকতে পারে না।
নিজের সুদীর্ঘ সাংগঠনিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বাস্তব উদাহরণ উপস্থাপন করে আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত প্রকাশ করেন যে, অতীতে তাঁর এক বিশেষ অনুষ্ঠানে কয়েকজন মুসলিম শ্রোতাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন যে, আপনারা একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন পরিচালনা করেন এবং প্রতিনিয়ত হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা প্রচার করেন; এমতাবস্থায় ভারতের অগণিত সাধারণ মুসলিমদের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে? আপনারা কি একসময় মুসলিমদের এই দেশ থেকে বের করে দেবেন? উক্ত প্রশ্নের সরাসরি জবাবে তিনি সেদিন আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, কোনো সম্প্রদায়কে বহিষ্কার করা মোটেও হিন্দুত্বের বার্তা নয়। সকলকে সাথে নিয়ে চলা এবং বৈচিত্র্যকে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়াই হলো প্রকৃত সামাজিক ধর্ম।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত
আরএসএস কর্মীদের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, হরিয়ানায় দুটি বিমানের আকস্মিক ও ভয়াবহ সংঘাত ঘটার পরপরই আরএসএসের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হন এবং উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুর্ঘটনার পর যেসকল যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছিল কিংবা যাঁরা মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী। তবে পরম বিপদের দিনে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত স্বয়ংসেবকেরা এক মুহূর্তের জন্যও সেটিকে ধর্মীয় চশমায় বিচার করেননি। আক্রান্ত মানুষের পরিচয় শুধুই 'মানুষ'—এই বিশ্বাস থেকে তাঁরা আহতদের হাসপাতালে পাঠান এবং মরদেহ উদ্ধারের পর স্ব-স্ব মর্যাদা রক্ষা করে শেষকৃত্যের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।
মোহন ভগবত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, মানবিক বিপর্যয় কিংবা সার্বিক সামাজিক সংকটে মানুষের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত শুধুই মানবতা। ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাস দেখে সেবামূলক কার্য পরিচালনা করার কোনো অবকাশ নেই। পৃথিবীর সর্বত্র চলমান অস্থিতিশীলতা ও মেরুকরণের বিপরীতে পারস্পরিক পরম সহনশীলতা বজায় রাখাই একমাত্র শান্তির পথ। বিশ্বজুড়ে পরমতঅসহিষ্ণুতা ও উগ্র মানসিকতার বিকাশের বিপরীতে সংঘাতহীন বিশ্ব গঠনে এ ধরণের উদার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরএসএস প্রধানের এই নজিরবিহীন ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বক্তব্য বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বহু ধর্মীয় কাঠামোর সুরক্ষায় এ ধরণের সম্প্রীতির বার্তা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশিষ্টজনেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। সংঘাত এড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা গড়ে তোলাই আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও নিউইয়র্ক সম্মেলন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।