প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ এবং চলাচলের রাস্তার পাশে থাকা একটি গাছের মালিকানা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এই নির্মম ও মর্মান্তিক ঘটনায় লাঠির আঘাতে মিজান মিয়া নামের এক স্থানীয় রাজনীতিবিদের মৃত্যু হয়েছে। নিহত মিজান মিয়া জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছে মনোহরদী উপজেলার বড়চাপা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বড়চাপা পূর্বপাড়া গ্রামে। ভরদুপুরে এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় ডিবি পুলিশের স্পেশাল ড্রাইভ: অস্ত্র, মাদক ও নগদ টাকাসহ গ্রেফতার ২
স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতের স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত মিজান মিয়া (৪০) বড়চাপা পূর্বপাড়া গ্রামের সফুর উদ্দিনের ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ হলো একই গ্রামের বাসিন্দা ও একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শহীদুল্লাহ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। মিজান মিয়া ও তাঁর চাচা শহীদুল্লাহর পরিবারের মধ্যে বসতবাড়ির সীমানা সংলগ্ন একটি চলাচলের রাস্তা এবং জমি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের কোন্দল ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন চলছিল। এই বিরোধ মেটাতে ইতিপূর্বে একাধিকবার সামাজিকভাবে বৈঠক ও স্থানীয় মাতব্বরদের মাধ্যমে সালিশ দরবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একাধিক শালিসি বৈঠকে স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা বিষয়টির একটি সুনির্দিষ্ট ও সুষ্ঠু মীমাংসা করে দেওয়ার চেষ্টা করলেও অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ তা মানতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিরোধ পুষে রাখেন।
শনিবার দুপুরের দিকে ওই বিরোধপূর্ণ সড়কের পাশে থাকা একটি গাছের ডালপালা কাটতে কিংবা গাছ সরাতে যান মিজান মিয়া। এই দৃশ্য দেখে অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ ও তাঁর স্বজনরা সেখানে উপস্থিত হন এবং গাছ কাটতে তীব্র বাধা প্রদান করেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি ও প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কথার পিঠে কথা কাটাকাটির সময় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, উত্তেজনার একপর্যায়ে শহীদুল্লাহর ছেলে জীবন ক্ষিপ্ত হয়ে একটি ভারী শক্ত লাঠি নিয়ে এসে মিজান মিয়ার মাথায় সজোরে মারাত্মক আঘাত করেন। মাথার সংবেদনশীল স্থানে সরাসরি আঘাত লাগার সাথে সাথেই মিজান রক্তসংক্রান্ত মারাত্মক জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সংজ্ঞাহীন হয়ে যান।
ঘটনার পর আশপাশের প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনরা দ্রুত এগিয়ে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় মিজানকে উদ্ধারের জন্য ছোটেন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তবে আঘাতের তীব্রতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর প্রানের স্পন্দন থেমে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মিজানকে মৃত ঘোষণা করেন। মিজান মিয়ার মৃত্যুর সংবাদটি বড়চাপা পূর্বপাড়া গ্রামে পৌঁছালে নিহতের স্বজনদের কান্নায় পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং জমিজমার জের ধরে এমন নিষ্ঠুর প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র নিন্দা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল
ঘটনার পর পরই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হলে মনোহরদী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় মাথার পেছনের অংশে গুরুতর আঘাতের আলামত পাওয়া গেছে বলে প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত পিতা ও পুত্রসহ জড়িত অন্যান্যদের আটক করতে বিভিন্ন স্থানে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
বড়চাপা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় প্রতিনিধিবৃন্দ ও সুশীল সমাজের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে এই দুই পরিবারের মধ্যে সীমানা সংক্রান্ত বিরোধটি চললেও বিষয়টি এভাবে একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে রূপ নেবে তা কারো ধারণায় ছিল না। শালিসী বৈঠক অমান্য করার মানসিকতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক শত্রুতার কারণে আজ একটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। এলাকার সার্বিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিহতের পরিবার এবং গ্রামবাসী প্রশাসনের কাছে দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এই ধরনের সহিংস অপরাধ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মনে করেন সচেতন মহল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।