পাবনায় চলন্ত ট্রেনের নিচে র আত্মহত্যাচেষ্টা করা কিশোরীকে জীবন বাজি রেখে বাঁচালেন মহেন্দ্রপুরের সাহসী যুবক

পাবনায় চলন্ত ট্রেনের নিচে আত্মহত্যার চেষ্টা করা কিশোরীকে জীবন বাজি রেখে বাঁচালেন মহেন্দ্রপুরের সাহসী যুবক
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও সুন্দর জনপদ হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক পাবনা জেলার রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি এক রোমহর্ষক, হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। জীবনের নানা ধরনের না পাওয়ার বেদনা, পারিবারিক জটিলতা এবং চরম মানসিক হতাশার বশবর্তী হয়ে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণী বা কিশোরী নিজের অমূল্য জীবন বিসর্জন দেওয়ার এক ভয়াবহ ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। চলন্ত একটি ভারী ট্রেনের ঠিক মুখোমুখি রেললাইনের ওপর গিয়ে আকস্মিক এই আত্মহত্যার অপচেষ্টা চালানোর সময় মুহূর্তের মধ্যে এক অলৌকিক ও সাহসিকতাপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়। মহেন্দ্রপুর এলাকার এক অদম্য সাহসী ও মানবিক যুবক নিজের জীবন বিপন্ন করার চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে চোখের পলকে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ওই কিশোরীকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে টেনেহিঁচড়ে নিরাপদ দূরত্বে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এক সেকেন্ডের এদিক-সেদিক হলে ঘটে যেতে পারত এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, যা পুরো পাবনা জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ওই যুবকের সাহসিকতার প্রশংসা উচ্চারিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে ধর্মীয় সেবকদের সম্মানী বিতরণ ও জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা সূত্রে সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে যে, গত শনিবার (১৫ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) সন্ধ্যার ঠিক প্রাক্কালে পাবনা রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে ছেড়ে আসা ঢালারচর এক্সপ্রেস নামক জনপ্রিয় যাত্রীবাহী ট্রেনটি নির্ধারিত গতিতে মহেন্দ্রপুর অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ট্রেনটি যখন স্থানীয় ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের উত্তর পাশের সংবেদনশীল রেললাইন এলাকা অতিক্রম করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে হুট করে ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরী রেললাইনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং চলন্ত ট্রেনের সামনে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার চূড়ান্ত আত্মঘাতী প্রয়াস চালান। চারপাশের মানুষ যখন আতঙ্কে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল এবং ট্রেনটি যখন একেবারে সন্নিকটে চলে এসেছিল, ঠিক সেই অত্যন্ত সংকটময় ও রোমহর্ষক মুহূর্তে মহেন্দ্রপুর এলাকার জনৈক সাহসী ব্যক্তি এক মুহূর্তের জন্যও নিজের জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বিদ্যুৎগতিতে রেললাইনের দিকে ছুটে যান। চরম সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তিনি ঠিক ট্রেনটি ধাক্কা দেওয়ার আগের মুহূর্তে ওই কিশোরীকে সজোরে কোল ঘেঁষে বা টেনে ধরে রেললাইনের ওপর থেকে নিরাপদে সরিয়ে আনেন, যার ফলে অল্পের জন্য রক্ষা পায় একটি তরতাজা প্রাণ।

আরও পড়ুন: পোরশায় মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের বিশেষ উঠান বৈঠক

জীবন বাঁচানোর এই রোমাঞ্চকর ঘটনার পরপরই মহেন্দ্রপুর এলাকার তরুণ সমাজ ও স্থানীয় যুবকদের কয়েকজন সদস্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসেন এবং হতভম্ব ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ওই কিশোরীকে শান্ত করার চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে তাঁরা সম্মিলিতভাবে অত্যন্ত মানবিকতার পরিচয় দিয়ে কিশোরীটিকে ওই এলাকার মহিলা এতিমখানার ঠিক পূর্ব পাশে অবস্থিত সুপরিচিত 'স্টীলমার্ক এস এস কারখানার' সম্মানিত প্রোপাইটর মো. শাহিন হোসেনের দাপ্তরিক কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে এই লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর সংবাদটি দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থল এবং সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের চারপাশে উৎসুক স্থানীয় সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমে যায়। চরম মানসিক আঘাতের শিকার ওই কিশোরী তখন ভয়ে ও আতঙ্কে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না, ফলে স্থানীয় লোকজন অত্যন্ত যত্নের সাথে তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে শান্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে পুরো বিষয়টি অবগত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথেই জেলা পুলিশ, পাবনার একটি বিশেষ চৌকস টহল টিম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর উদ্ধারকৃত কিশোরীটির কাছে গিয়ে অত্যন্ত স্নেহের সাথে তার নাম-পরিচয় ও ঘটনার কারণ জানার চেষ্টা করেন এবং তাকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা প্রদান করেন। দীর্ঘক্ষণ আইনি ও সামাজিক প্রক্রিয়া এবং যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে ওই দিন রাতেই আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে (রাত ১১:০০ ঘটিকা) কিশোরীটিকে কোনো ধরনের বিপদে না ফেলে সম্পূর্ণ নিরাপদে তার নিজ মায়ের জিম্মায় হস্তান্তর করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য এবং পারিবারিক বিভিন্ন সূত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, অত্যন্ত সুগভীর পারিবারিক কলহ, বিভিন্ন ধরনের জটিল মানসিক চাপ এবং নানামুখী হতাশার কারণেই মূলত ওই কিশোরী এমন চরম ও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মারাত্মক পথ বেছে নিয়েছিল।

উদ্ধার হওয়া ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর নাম তোকিয়া আক্তার তোয়া (১৫) এবং তার পারিবারিক স্থায়ী ঠিকানা হলো পাবনা পৌর শহরের জনবহুল মণ্ডলপাড়া এলাকা। পুলিশ ও স্থানীয়দের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে আরও উন্মোচিত হয়েছে যে, কিশোরীটির পারিবারিক জীবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত অশান্ত ও জটিলতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল। জানা যায়, তার বাবা ইতিপূর্বে প্রথম সংসার চলমান থাকা অবস্থায় গোপনে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং বর্তমান সময়ে সৎ মায়ের সাথে একই ছাদের নিচে বসবাস করার সুবাদে প্রতিনিয়ত তাকে নানা ধরনের কটূক্তি, মানসিক নির্যাতন ও অসহ্য পারিবারিক প্রেশারের শিকার হতে হতো। পরিবারের এই অবিরত মানসিক অত্যাচার, আপন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং দিনের পর দিন ঘরের ভেতর জমে থাকা তীব্র অভিমান ও ক্ষোভের কারণেই একপর্যায়ে কিশোরীটির কোমল মনে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যার ফলশ্রুতিতে সে পৃথিবীর সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন চিরতরে শেষ করে দেওয়ার এই মারাত্মক পথ বেছে নিয়েছিল।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সম্ভাব্য অপমৃত্যু ও মর্মান্তিক প্রাণহানি অত্যন্ত সফলভাবে ঠেকানোর ক্ষেত্রে মহেন্দ্রপুর এলাকার সেই নাম না জানা কিংবা পরিচিত সাহসী যুবকের ঐতিহাসিক সাহসিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অকৃত্রিম মানবিকতা সমগ্র সমাজের মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের মায়া ত্যাগ করে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি কিশোরীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে তিনি যে অনন্য সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই সর্বমহলে গভীর প্রশংসা ও পরম শ্রদ্ধার দাবিদার। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি এমন সাহসী ও মানবিক যুবকেরা এভাবে এগিয়ে আসেন, তবে বহু অপ্রীতিকর ঘটনা ও আত্মহত্যার মতো পথ থেকে পথহারা তরুণ প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কিশোরী তোকিয়া আক্তার তোয়া যেন ভবিষ্যতে এমন কোনো চরম হতাশার গহ্বরে পা না বাড়ায় এবং তার অভিভাবকরাও যেন সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন, সেই প্রার্থনা ও প্রত্যাশাই এখন সচেতন মহলের সকলের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে।

সূত্র: স্থানীয় পুলিশ প্রেস নোট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন