প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে আকস্মিক জুলাই বন্যায় ছারখার হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর দুর্দশা দিন দিন আরও চরম রূপ ধারণ করছে। বানের তীব্র স্রোতে লোকালয় থেকে জলরাশি নেমে যাওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ সময় অতিবাহিত হলেও দুর্গত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে পারেনি। বিশেষ করে প্রান্তিক পলি অঞ্চলগুলোর সহায়-সম্বলহীন খেটে খাওয়া পরিবারের সদস্যরা নিত্যদিনের অন্ন সংস্থান ও আশ্রয় পুনর্গঠনে চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। মেহেরনামা ইউনিয়নের চৈয়ুরভাঙা কোনারপাড়া এলাকার এক অসহায় পরিবারের আর্তনাদ এখন পুরো এলাকাবাসীর হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: সোনামুড়ায় যৌথ বাহিনীর বিশাল অভিযান, ৭০ লাখ টাকার গাঁজার চারা ও বীজ ধ্বংস
সরেজমিনে অনুসরণে জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার উত্তর মেহেরনামা গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত চৈয়ুরভাঙা কোনারপাড়ার বাসিন্দা ইসমত আরা (৩২) এবং তাঁর স্বামী মোহাম্মদ রুবেল দম্পতির পুরো বিশ্ব উলটপালট হয়ে গেছে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যায়। পাহাড়ি ঢল ও প্লাবনের তোড়ে তাঁদের মাথা গোঁজার একমাত্র অবলম্বন মাটি ও টিনের তৈরি কাঁচা ঘরটি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে পাঁচজন নাবালিকা কন্যা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ দোকানঘরের মধ্যে পলিথিন খাটিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন এই দম্পতি। মাথার ওপর নামমাত্র পলিথিনের ছাউনি ছাড়া রোদ-বৃষ্টি ও সামুদ্রিক ঝোড়ো হাওয়া থেকে আত্মরক্ষার কোনো সুব্যবস্থা নেই তাদের।
প্রকৃতির দুর্যোগ কেবল তাঁদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠিকানা কাড়েনি, বরং কেড়ে নিয়ে গেছে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় মৌলিক অনুষঙ্গগুলোও। পরিবারের পাঁচ কন্যার মধ্যে তিনজন স্থানীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আসছিল। বানের তোড়ে ভেসে গেছে তাদের মূল্যবান বইপত্র, লেখার খাতা ও বিদ্যালয়ের পোশাক। অন্য দিকে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মোহাম্মদ রুবেল দীর্ঘ দুই মাস ধরে মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। কাজের অক্ষমতার কারণে ঘরে নেই কোনো জমানো সঞ্চয়, যার দরুন অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসাসেবা চালানো যেমন অসম্ভব হয়ে উঠেছে, তেমনি সন্তানদের মুখে প্রতিদিন দুবেলা অন্ন তুলে দেওয়াও এক মহা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধান কর্তৃক আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের শুভ উদ্বোধন
পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সাম্প্রতিক বিধ্বংসী প্লাবনে পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় ৫০০টি কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশে গেছে এবং ১ হাজার ২৪৯টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সহায়-সম্বলহীনদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘর পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় পলিথিনের নিচে কত দিন টিকবে এই অসহায় পরিবারের অবোধ শিশুরা—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অসুস্থ পিতার চিকিৎসার খরচ জোগানো এবং কোমলমতি সন্তানদের ভেস্তে যেতে বসা শিক্ষার স্বপ্ন ফের বাঁচিয়ে তুলতে সমাজের স্বনামধন্য বিত্তবান, মানবিক সংগঠন ও সমাজসেবীদের অবিলম্বে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছেন দুস্থ ইসমত আরা ও এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।