প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে চরম বিপর্যয় ও তীব্র মেগাওয়াট ঘাটতির দরুন দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের তফাত এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, বিদ্যুৎ সরবরাহের সূচক সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। পাওয়ারগ্রিড বাংলাদেশ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর দৈনিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, রোববার দিবাগত রাত ১টার দিকে সারাদেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়, যা চলতি গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে জাতীয় গ্রিডের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতির ঘটনা। এর আগে একই দিন বিকেল ৩টার দিকে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। ক্রমাগত চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: জামালপুরে গৃহবধূ নির্যাতন মামলায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড
বর্তমানে দেশের প্রান্তিক জেলা, উপজেলা ও বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদগুলোতে দিন ও রাত মিলিয়ে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড তাপদাহ, ভ্যাপসা গরম এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একই সাথে সেচ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও গ্রামীণ পোল্ট্রি, ডেইরি ফার্মসহ ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকায় মারাত্মক বাণিজ্যিক ও আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক উদ্যোক্তারা।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলমান এই মহাবিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রাথমিক জ্বালানির তীব্র সংকট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে অকেজো বা বিকল হওয়ার পর থেকেই মূলত জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা আশঙ্কাজনকভাবে ভেঙে পড়ে। বর্তমানে উক্ত টার্মিনালটি আংশিক সংস্কারের মাধ্যমে সচল করা হলেও জাতীয় গ্রিডে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পূর্বের স্বাভাবিক চাহিদার সমপরিমাণে ফেরানো সম্ভব হয়নি। গ্যাসের তীব্র সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্পষ্ট রূপে।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা সড়কে গরুর ট্রাক পুকুরে, ৯টি গরুর মৃত্যু
জ্বালানি ঘাটতির প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে একলাফে নেমে বর্তমানে মাত্র সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কেবল গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা অঞ্চলে অবস্থিত আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে গেছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ফার্নেস অয়েল ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংকটে অনেক বেসরকারী ভারী জ্বালানিভিত্তিক (HFO) কেন্দ্রও নিজেদের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছে।
জাতীয় পাওয়ারগ্রিড কোম্পানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রোববার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা এবং মধ্যরাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ পিক আওয়ারের সময়গুলোতে জাতীয় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট কম ছিল। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধানের কারণে বাধ্য হয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানিগুলোকে সারাদেশে বাধ্যতামূলক 'অঘোষিত লোডশেডিং' বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উপায়ে গ্যাস ও প্রাথমিক জ্বালানি আমদানির ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: পাওয়ারগ্রিড বাংলাদেশ ও বিদ্যুৎ বিভাগ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।