ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতার দায়ে রুশ বিরোধীদলীয় নেতা লেভ শ্লোসবার্গকে ১১ বছরের কারাদণ্ড

ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতার দায়ে রুশ বিরোধীদলীয় নেতা লেভ শ্লোসবার্গকে ১১ বছরের কারাদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

আধুনিক বিশ্বের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করার ক্ষেত্রে বর্তমান রুশ ফেডারেশনের রাজনৈতিক পরিবেশ এক চরম ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের সমস্ত দাবিকে পাশ কাটিয়ে যখনই কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আওয়াজ তোলে, তখন ক্রেমলিনের শাসনব্যবস্থা তাদের দমনে অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে থাকে। পূর্ব ইউরোপের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত পরাশক্তি রাশিয়ার অভ্যন্তরে চলা ইউক্রেনীয় সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করা এবং পুতিন প্রশাসনের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অপরাধে দেশটির প্রথিতযশা এক বিরোধীদলীয় প্রবীণ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেওয়ার ফলস্বরূপ দেশটির একটি আদালত প্রখ্যাত এই রাজনীতিককে দীর্ঘমেযাদী কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার মহলে এক বিরাট ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে।

আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গের দুই সন্তান নীতির প্রস্তাব ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হযরত আবদুল হাকিম জুনায়েদের মন্তব্য

ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যাবলি থেকে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর দিনটি অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই দণ্ডাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ঠিক একদিন পূর্বে, অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার ঐতিহাসিক পসকভ শহরের একটি আঞ্চলিক আদালতে রুশ সামরিক বাহিনীকে প্রকাশ্যে অবমাননা করা এবং বর্তমান পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে 'মিথ্যা তথ্য' ও অপপ্রচার ছড়ানোর কাল্পনিক অভিযোগে এই বিচারিক রায় ঘোষণা করা হয়। অভিযুক্ত এই প্রবীণ ও পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বর্তমান বয়স ৬৩ বছর এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিনের নীতির কড়া সমালোচক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের সামরিক আগ্রাসনের শুরু থেকেই তিনি এই যুদ্ধের চরম বিরোধিতা করে আসছেন এবং সাধারণ মানুষের সামনে এর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা মূলত বর্তমান রুশ প্রশাসনের সহ্যসীমার বাইরে চলে গিয়েছিল এবং তার ফলশ্রুতিতে এই মর্মান্তিক বিচারিক পরিণতি নেমে এসেছে।

দণ্ডপ্রাপ্ত এই প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতার পরিচয় সূত্রে জানা যায় যে, তিনি রুশ রাজনৈতিক অঙ্গনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং রাশিয়ার অন্যতম প্রধান উদারপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত ‘ইয়াবলোকো’ (Yabloko) দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সবসময় দেশের ভেতরে বাকস্বাধীনতা রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন, যার কারণে সাধারণ বুদ্ধিজীবী ও ভিন্নমতাবলম্বী মহলে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান ছিল। কিন্তু বর্তমান পুতিন প্রশাসনের জাঁতাকলে পড়ে তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং আদালত কর্তৃক তাকে ১১ বছর এক মাসের দীর্ঘ কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলার জন্য একজন প্রবীণ রাজনীতিককে এভাবে প্রায় এক যুগের বেশি সময় কারাবাসের সাজা দেওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে রাশিয়ায় বিরোধীদের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য কিরূপ কঠোর নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সহায়তায় জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে ঢাকা থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল ফরিদপুর থেকে উদ্ধার

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আদালত কর্তৃক এই কঠোর সাজা ঘোষণার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রুশ সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত সুকৌশলে তার রাজনৈতিক দল ‘ইয়াবলোকো’-কেও আসন্ন সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নির্ধারিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্পূর্ণ অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। আদালতের এমন দ্বিমুখী ও কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে যেমন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কারাবন্দী করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পুরো রাজনৈতিক দলটিকে ব্যালট পেপার বা নির্বাচনী লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে রাশিয়ায় অবশিষ্ট রাজনৈতিক বিরোধিতাকে পুরোপুরি নির্মূল করার শামিল। দেশের অভ্যন্তরে পুতিন সরকারের বিরোধিতাকারী কোনো রাজনৈতিক শক্তি যেন ভবিষ্যতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এই আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নামমাত্র নির্বাচনের ডামাডোলের আড়ালে আসলে বিরোধীশূন্য একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করাই যে ক্রেমলিনের মূল লক্ষ্য, এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

রুশ আদালত কর্তৃক প্রবীণ রাজনীতিক লেভ শ্লোসবার্গের বিরুদ্ধে এই অত্যন্ত কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড প্রদানের ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) এই বিচারিক রায়কে একটি সম্পূর্ণ "বর্বর সাজা" হিসেবে তীব্র ভাষায় আখ্যায়িত করেছে এবং পুতিন প্রশাসনের এই দমনপীড়নী নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাটির পক্ষ থেকে অবিলম্বে এবং কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই লেভ শ্লোসবার্গকে কারামুক্ত করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে, কারণ কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ ও যুদ্ধের বিরোধিতা করার কারণে কাউকে এভাবে সাজা দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের চরম লঙ্ঘন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন গণমাধ্যম, মানবাধিকার কর্মী এবং কূটনৈতিক মহল মনে করছে যে, এই সাজা কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করেনি, বরং এটি রাশিয়ার বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার সমতুল্য একটি ঘটনা।

পরিশেষে বলা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করার অপরাধে রাশিয়ার প্রখ্যাত বিরোধীদলীয় রাজনীতিক লেভ শ্লোসবার্গকে প্রদত্ত ১১ বছর এক মাসের এই কারাদণ্ড বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অসহিষ্ণুতা ও স্বৈরাচারী দমনের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে যুদ্ধ জিইয়ে রাখা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কারাগারে নিক্ষেপ করার এই সংস্কৃতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত চাপ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোরালো দাবির মুখে রাশিয়ার ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। নিপীড়নের মুখেও যারা সত্যের পক্ষে কথা বলেন, ইতিহাসের পাতায় তাদের আত্মত্যাগ সবসময় অমর হয়ে থাকবে এবং মানুষের মুক্তির সংগ্রাম কখনো বৃথা যেতে পারে না।

সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও মানবাধিকার প্রেস নোট।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন