প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা সেতু এলাকা জুড়ে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সবসময় সর্বোচ্চ মাত্রায় বজায় থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকামুখী বিভিন্ন দূরপাল্লার যানবাহনের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে মাদকদ্রব্য চোরাচালানের যে রুটগুলো সক্রিয় রয়েছে, সেগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে পুলিশ প্রশাসন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন চেকপোস্টে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি এই কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের বহু বড় বড় চালান মাঝপথেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়ক এলাকায় পুলিশ এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর সাফল্য অর্জন করেছে, যা দেশের মাদক সিন্ডিকেটগুলোকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। একটি সাধারণ মালবাহী ট্রাকের কেবিনের ভেতরে সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা কোটি কোটি টাকার মরণঘাতী মাদকদ্রব্য হেরোইনসহ কুখ্যাত দুই মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়েছে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে সার ডিলারদের নিয়ে কৃষি বিভাগের বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং পুলিশ প্রশাসনের দাপ্তরিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল গত সোমবার ভোরের দিকে যখন গভীর রাতের অন্ধকার ভেদ করে চারপাশ সুনসান নীরবতায় আচ্ছন্ন ছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আনুমানিক সোয়া একটা বাজছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে যমুনা সেতু পশ্চিম টোল প্লাজা সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ঢাকাগামী সমস্ত সন্দেহভাজন যানবাহনকে সিগন্যাল দিয়ে থামিয়ে তল্লাশি করার নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওই নির্দিষ্ট মালবাহী ট্রাকটিকে থামানোর জন্য সংকেত দেওয়া হয়। ট্রাকটির চালক ও সহযোগীর গতিবিধি এবং আচরণে পুলিশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ দলটির মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলে তারা গাড়িটিকে খুব নিখুঁতভাবে তল্লাশি করার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কঠোর ও সুচারুভাবে চালানো ওই তল্লাশি অভিযানে ট্রাকটির বিশেষ কেবিন বা ড্রাইভিং সিটের ভেতরের বিভিন্ন গোপন অংশ থেকে মোড়ানো অবস্থায় এই বিশাল মাদকের চালানটি উদ্ধার করা হয়, যা উপস্থিত পুলিশ সদস্যদেরও হতবাক করে দিয়েছিল।
উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্যের পরিমাণ এবং এর আনুমানিক আর্থিক বাজারমূল্য হিসাব করলে যে কারো চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা। প্রাথমিক পরিমাপ অনুযায়ী জব্দকৃত এই সর্বনাশা হেরোইনের মোট ওজন চার কেজি তিনশ ত্রিশ গ্রাম হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বর্তমান অবৈধ মাদক বাজারের মূল্য অনুযায়ী প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি। কেবল বিপুল পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার করেই এই অভিযান সমাপ্ত হয়নি, বরং ওই ট্রাকের কেবিন থেকে মাদকদ্রব্যের নেশা তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত বিয়াল্লিশটি বিশেষ অ্যাম্পুল এবং আটটি ইনজেকশনও জব্দ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মরণঘাতী মাদক ও রাসায়নিক উপকরণের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো সাধারণ খুচরা ব্যবসার জন্য নয়, বরং দেশের বড় কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকায় সরবরাহের জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বহন করা হচ্ছিল। অবৈধ এই মালের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত মালবাহী ট্রাকটিকেও পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জব্দ করে থানায় নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন: বগুড়ায় স্কুল বাস খাদে পড়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মৃত্যু, আহত আরও পনেরো জন
এই চাঞ্চল্যকর অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হাতেনাতে পাকড়াও হওয়া দুই অভিযুক্ত ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান মাদক কারবারির নাম আবু বক্কর সিদ্দিক, যার বয়স আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর এবং তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মহারাজপুর থানার অন্তর্গত মহারাজপুর গ্রামের বিচারত আলীর সুযোগ্য সন্তান। এই অপরাধের সঙ্গে সমানভাবে জড়িত অপর অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম সোহাগ আলী, যিনি রাজশাহী জেলার অত্যন্ত পরিচিত গোদাগাড়ী থানার সুলতানগঞ্জ গ্রামের লালবর মিয়ার পুত্র বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পন্থায় এই সমস্ত ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ট্রাকের বিভিন্ন গোপন খোপে লুকিয়ে তারা বিভিন্ন গন্তব্যে পাচার করে আসছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই মাদক চোরাচালানের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং এই চালানের পেছনে অর্থায়নকারী মূল গডফাদারদের নাম প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।
ঘটনার সামগ্রিক বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে যমুনা সেতু পশ্চিম থানার দায়িত্বশীল উপপরিদর্শক বা এসআই মোস্তাফিজ সংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, গত সোমবার দুপুরে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক তদন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করার পর এই দুই আসামিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে এই সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়ক দিয়ে যাতে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য বা অবৈধ অস্ত্র রাজধানীতে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশের চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশির মাত্রা সবসময় কঠোর রাখা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ পুলিশের এই সাহসী ও সময়োপযোগী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও এর অবাধ বিস্তার বর্তমান সমাজের ভিত্তিগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সিরাজগঞ্জের এই মহাসড়কে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার হেরোইন জব্দের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে মাদক কারবারিরা তাদের কৌশল বদলালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সজাগ দৃষ্টির কারণে তারা পার পেয়ে যেতে পারছে না। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হওয়া সম্ভব। আমরা আশা করি তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের শেকড় কোথায় ছড়িয়ে রয়েছে তা উদঘাটন করা হবে এবং জড়িত সকল কুশীলব আইনের আওতায় আসবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, যমুনা সেতু পশ্চিম পাড় সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে ট্রাক থেকে চার কেজি তিনশ ত্রিশ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার এবং দুই মাদক কারবারিকে আটকের ঘটনাটি পুলিশের পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই সফল অভিযানের ফলে দেশের মাদক বাজারে বড় ধরনের আঘাত হান সম্ভব হয়েছে এবং জনমনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এসেছে। আমরা প্রত্যাশা করি দেশ থেকে মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান ও তৎপরতা অবিরাম গতিতে অব্যাহত থাকবে। একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার এই সংগ্রামে প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা সবসময় অটুট থাকুক—এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: যমুনা সেতু পশ্চিম থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।