প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের ভারী শিল্পাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত বিতর্কিত 'ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড'-এর সমস্ত ধরনের কার্যক্রম ও জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডের অপারেশন এক সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক এক দুর্ঘটনায় উক্ত ইয়ার্ডের ভেতর বিষাক্ত গ্যাসের নীরব আক্রমণে ৯ জন নিবেদিতপ্রাণ শ্রমিকের আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর শোকাবহ ঘটনার পর এই কঠোর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গত শুক্রবার সংঘটিত ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর থেকেই সমগ্র দেশজুড়ে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিক নিরাপত্তা এবং ইয়ার্ড মালিকপক্ষের চরম অবহেলার বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক অধিকার রক্ষা এবং সঠিক তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) জরুরি ভিত্তিতে এই স্থগিতাদেশের ঘোষণা প্রদান করে, যা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ঘটনার নেপথ্যের সার্বিক বিশদ বিবরণ থেকে জানা যায় যে, গত শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী উপকূলের উক্ত শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নোঙর করা 'এমটি রাসি' নামক একটি পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ জাহাজের অভ্যন্তরে প্রতিদিনের মতো সাধারণ শ্রমিকের দল তাদের নির্ধারিত কাটার ও ভাঙার কাজ পরিচালনা করছিল। কিন্তু জাহাজটির অভ্যন্তরীণ রুদ্ধ বা বদ্ধ পরিবেশে কাজ করার ঠিক সেই মুহূর্তে আকস্মিকভাবে অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও গন্ধহীন বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাস সিলিন্ডার বা জাহাজের নিজস্ব বন্ধ খোপ থেকে নির্গত এই বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাসের তীব্র প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যে একে একে সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়েন ৯ জন হতভাগ্য শ্রমিক। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও তাৎক্ষণিক রেসকিউ ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে ঘটনাস্থলেই তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে, যা পুরো শিল্পাঞ্চলে এক গভীর শোকের ছায়া ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নের কৃষকদের দাবি মেনে নিয়ে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত
এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনার ঠিক পরপরই সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে, ঘটনার দিন গত শনিবার রাতে খোদ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব মহোদয় স্বয়ং সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত উক্ত দুর্ঘটনাকবলিত কারখানা এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করতে আসেন। ঘটনাস্থলের সার্বিক পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখার পর এবং শ্রমিকদের সাথে কথা বলার পর তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে জরুরি বৈঠক করেন। পরবর্তীতে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য চলমান উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কার্যক্রমের শতভাগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো এবং কারখানার ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ নিরাপদ করার স্বার্থে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) জরুরি বৈঠকে বসে এবং এই এক সপ্তাহের স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে যে, এটি কেবল একটি সাধারণ আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক অবহেলা ও আইনি লঙ্ঘন জড়িত রয়েছে। জানা গেছে, গত জুলাই মাসেই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সীতাকুণ্ডের এই ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কারখানার অভ্যন্তরে কর্মরত শ্রমিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, পর্যাপ্ত ও আধুনিক সেফটি গিয়ার বা সুরক্ষামূলক পোশাক সরবরাহ না করা এবং শ্রম আইনের বিভিন্ন বিধান লঙ্ঘন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এই মামলাটি করা হয়েছিল। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করার কারণেই আজকের এই ভয়াবহ ৯ শ্রমিকের জীবনহানির ঘটনা ঘটল বলে মনে করছেন শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন মহল।
বর্তমানে স্থগিতাদেশের এই এক সপ্তাহের সময়সীমায় তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইয়ার্ডের ভেতর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি এবং কারখানার গাফিলতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণগুলো খতিয়ে দেখে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। শিল্পাঞ্চলে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ইয়ার্ডগুলোর ওপর নিয়মিত ও কড়া মনিটরিং করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: বিএসবিআরএ প্রেস নোট ও শিল্প মন্ত্রণালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।