প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় ভয়াবহ এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিষাক্ত গ্যাসের প্রকোপে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) সকাল ৯:০০ টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত স্টেশন রোড সংলগ্ন 'ফেরদৌস স্টিল' নামের একটি শিপব্রেকিং ও রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি উন্মোচিত হয়। পুরাতন এলএনজি পরিবাহী জাহাজের সুনির্দিষ্ট গ্যাস সিলিন্ডার ও ট্যাংক সঠিকভাবে গ্যাসমুক্ত না করে অপরিকল্পিতভাবে কাটার সময় বিষাক্ত রাসায়নিক বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে বিষাক্ত গ্যাসের শিকার হন কর্মরত শ্রমিকরা। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ইয়ার্ডে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালালে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়; পরবর্তীতে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আরও পড়ুন: বেগম খালেদা জিয়া ৮২তম জন্মদিনে বিএনপির দেশব্যাপী মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি
ভয়াবহ এই বিষাক্ত গ্যাস দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী ৮ জন শ্রমিকের মধ্য থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর ভাই মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। বাকিদের নাম-পরিচয় বিস্তারিতভাবে শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আরও পড়ুন: কাজিপুরে অপহৃত স্কুলছাত্র বেলকুচি থেকে উদ্ধার, মূল অপহরণকারী গ্রেপ্তার
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে হঠাৎ কারখানার অভ্যন্তর থেকে আতঙ্কিত শ্রমিকদের আর্তচিৎকার শুনতে পান আশপাশের মানুষ। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে দেখতে পান কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত যানবাহনে করে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু জাহাজের ভেতরের অংশে একাধিক শ্রমিকের মরদেহ পড়ে থাকার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা অবহেলার প্রতিবাদে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। উদ্ভূত উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতাকে শান্ত করে।
ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের ক্ষতিকারক প্রভাবে এলাকার পরিবেশে নজিরবিহীন বিষাক্ততা তৈরি হয়। ঘটনার সময় বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে খালের মুখ দিয়ে উপকূলের দিকে ফেরত আসা দুটি ইলিশ মাছ ধরার নৌকা রাসায়নিকের উৎকট ও তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধের কারণে তীরের কাছাকাছি আসতে ব্যর্থ হয়। কারখানার ভেতর থেকে নির্গত গ্যাসের ভয়াবহ তীব্রতা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, সাগরের মৎস্যজীবীরা ইয়ার্ডের পাশের খালে নৌকা না ভিড়িয়ে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে দূরবর্তী ঘাটে নোঙর করতে বাধ্য হন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, উক্ত কারখানা এলাকা থেকে দুই দফায় মোট ৭ জন রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ড. ইশতিয়াক রহমান জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই ৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং অপর একজনকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যায় রেখে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ঘটনাস্থলেই আরও ২ জনের মরদেহ পড়ে থাকার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেন সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর।
দুর্ঘটনার কারিগরি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে তাদের দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে রেসকিউ অভিযান পরিচালনা করে। তিনি জানান, স্ক্র্যাপ হিসেবে কেটে ফেলা ওই জাহাজটি মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনে ব্যবহৃত হতো। আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিধিমালা অনুযায়ী এ জাতীয় ভারী জাহাজ কাটার পূর্বে তার প্রতিটি ট্যাংকে সঞ্চিত ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড কিংবা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো মারাত্মক গ্যাসসমূহ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্কাশন ও শতভাগ গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফেরদৌস স্টিল কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের কার্যকর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান না করেই কাজ পরিচালনা করায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটেছে।
উক্ত ঘটনার বিষয়ে কারখানা মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার মুহূর্তে তিনি প্রাঙ্গণের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ইয়ার্ড সূত্রে তিনি ৬ থেকে ৮ জন শ্রমিকের অসুস্থতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার খবর পেয়েছেন এবং সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে সার্বিক বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে বলে দাবি করেন। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক শোক ও ক্ষোভের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।