প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা ও কৌশলগত সংঘাতের এক উত্তপ্ত মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো ও চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত তীব্র সামরিক পাল্টাধাওয়া ও প্রতিশোধমূলক অভিযানে ইসরায়েলের এক হাজারেরও বেশি সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুলফজল শেখারচি এই বিস্ফোরক বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক কৌশলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইরানি মুখপাত্র উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমা ও ইসরায়েলি বাহিনী রণক্ষেত্রে যে ধরনের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে তা কৌশলে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: রতনকান্দি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিদায়লগ্নে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
সামরিক অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুলফজল শেখারচি জানান, তেহরান কখনোই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনকে মেনে নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও কোনো ছাড় দেবে না। ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত বৈরী তৎপরতার যোগ্য জবাব দিতে সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোগুলোতে নির্ভুল নিশানা বজায় রেখে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের শীর্ষ গোয়েন্দা নজরদারি কেন্দ্র, নেটওয়ার্ক অপারেটিং পয়েন্ট, উচ্চমাত্রার তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং কৌশলগত সেনাঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এসব পাল্টাধাওয়া চালানো হয়। ইরানি মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, এসব সুনির্দিষ্ট রাডার ও গোয়েন্দা সেন্টারে শক্তিশালী আঘাত হানার কারণেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক রূপ ধারণ করেছে, যা ইসরায়েলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের বিষয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাবি উপস্থাপন করেছেন ইরানি সেনাবাহিনীর এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ও রণক্ষেত্রে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকশত সৈন্য এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত কয়েক হাজার মার্কিন সেনা গুরুতরভাবে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনমত ধরে রাখা সহ বৈশ্বিক সামরিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব যৌথভাবে এই বিপুল হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও তাদের নিজ দেশের সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে চরম গোপনীয়তার সাথে গোপন রাখছে। শেখারচির মতে, প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ পেলে মার্কিনী ও ইসরায়েলি সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হবে।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জের নিমগাছি বাজারে অগ্নিকাণ্ডে ৭ দোকান ছাই, ক্ষতি ১০ লাখ
মার্কিন যৌথ সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা ও প্রচার কৌশলকে চরম কটাক্ষ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখারচি মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে একটি তথাকথিত 'হলিউডনির্ভর ও মিডিয়া-প্রচারণাকেন্দ্রিক বাহিনী' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল সামরিক শক্তিমত্তা আসলে প্রোপাগান্ডা, হলিউডি চলচ্চিত্র ও মনস্তাত্ত্বিক প্রচারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক ও সুসংগঠিত কোনো প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে বাস্তবিক মাঠে কার্যকর নয়। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের অপ্রতিরোধ্য জবাবের মুখে মার্কিন বাহিনীর এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতা প্রস্ফুটিত হয়েছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর বিশ্বের বহু নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত সামরিক আধিপত্য ও প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজেদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে।
বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত ও স্পর্শকাতর জলপথ 'হরমুজ প্রণালি' নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে চরম আলটিমেটাম ও সতর্কবার্তা প্রদান করেছে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী। ইউএস প্রশাসন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় শেখারচি বলেন যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন পথকে নিজেদের ভূখণ্ড বা আধিপত্যের অংশ হিসেবে কল্পনা করা মার্কিনী ও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কেবলই এক অবাস্তব ও অলীক দুঃস্বপ্নের মতো। ইরান যেকোনো মূল্যে নিজ সমুদ্রসীমা, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব সার্বভৌম কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো দুর্ভাবনা বা সামরিক আগ্রাসনের অপচেষ্টা সমুদ্রবক্ষে কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও ইরানি সামরিক সূত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।