প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়নের কুমারহাটি মোহাম্মাদিয়া দাখিল মাদরাসা প্রাঙ্গণে কোমলমতি নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে সুমন হোসেন নামে এক যুবককে জুতার মালা পরিধান করিয়ে এলাকা ছাড়া করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে স্থানীয় গ্রামবাসী ও অভিভাবকরা অভিযুক্ত যুবককে হাতেনাতে আটক করে মাদরাসায় নিয়ে আসার পর সর্বসম্মতিক্রমে এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। অভিযুক্ত সুমন হোসেন পার্শ্ববর্তী মথনপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যা সন্তানের জনক। এমন স্পর্শকাতর ঘটনার চিত্র ভিডিও আকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরপরই সমগ্র জেলাজুড়ে চরম তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরানের দাবি: ইসরায়েলের ১ হাজার ও মার্কিন সেনার প্রাণহানি
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও মাদরাসার আশপাশের অধিবাসীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মথনপুর গ্রামের বাসিন্দা সুমন হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কুমারহাটি মোহাম্মাদিয়া দাখিল মাদরাসার নারী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথে নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে আসছিলেন। বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় তরুণ ও অভিভাবকদের নজরদারিতে ছিল। সোমবার সকালে ওই যুবক পুনরায় মাদরাসার প্রাঙ্গণে এসে শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করলে উপস্থিত গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ধরে এবং হাতেনাতে আটক করে। পরবর্তীতে তাকে মাদরাসা প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয় এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় তার বাবা, স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেখানে জরুরি ভিত্তিতে উপস্থিত হতে খবর দেওয়া হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় মাদরাসা চত্বরে উৎসুক জনতা ও ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের বিপুল সমাগম ঘটে। গণরোষ এড়াতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো সহিংসতা রোধে স্থানীয় ইউপি সদস্য, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জরুরি বৈঠকে বসেন। পরিবারের সদস্যদের সামনে যুবকের ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত অপকর্মের নজির তুলে ধরা হলে তারা চরম লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন। পরবর্তীতে উপস্থিত জনতার চরম ক্ষোভ থেকে ওই যুবককে প্রহারের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সামাজিক শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবারের সদস্যদের সম্মতিক্রমেই তাকে জুতার মালা পরিয়ে মাদরাসা থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত ও কার্যকর করা হয়।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য খাতে বিশ্বব্যাংকের সাথে প্রতিমন্ত্রীর বৈঠক ও যৌথ আলোচনা
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্ত সুমন হোসেনকে সর্বসম্মতিক্রমে জুতার মালা পরিয়ে অপমানজনকভাবে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। উক্ত ঘটনার দৃশ্য চিত্রায়িত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে নেটিজেনদের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, দুই কন্যা সন্তানের পিতা হয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা চরম নৈতিক অবক্ষয়ের শামিল। আবার অনেকে মনে করছেন, আইন নিজের হাতে না তুলে পুলিশ প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করা যুক্তিযুক্ত হলেও, এই দৃষ্টান্তমূলক সামাজিক শাস্তির ফলে অন্যান্য বখাটেরাও অপকর্ম করতে সাহস পাবে না।
উক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে কুমারহাটি মোহাম্মাদিয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষক সামাউল ইসলাম জানান, দীর্ঘ দিন ধরেই নারী শিক্ষার্থীরা যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্ত হওয়ার অভিযোগ করে আসছিল। সোমবার বখাটে যুবক ধরা পড়ার পর উত্তেজিত জনতার ক্ষোভ চরম মাত্রায় পৌঁছায়। ফলে জনতার প্রহার থেকে ওই যুবককে বাঁচাতে পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই তাকে জুতার মালা পরিয়ে মাদরাসা থেকে বের করার সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তরিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পর এলাকার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মাদরাসায় যান। অভিযুক্ত যুবক তাঁর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে স্থানীয়দের ও পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে জুতার মালা পরিয়ে বের করা হয়। অন্যদিকে মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদরাসা প্রাঙ্গণে বর্তমানে শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
ঝিনাইদহের এই ঘটনাটি গ্রামীণ সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ এবং নারী শিক্ষা সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বখাটেদের অপতৎপরতা রুখতে নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি আইনি কঠোরতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে কোনো বখাটে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করার সাহস পাবে না।
সূত্র: স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।