প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বৈশ্বিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের রাজধানী বিসকেকে আয়োজিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মুখোমুখি হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার টেবিলে স্থান করে নেয় ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী ইউক্রেন সংকট। বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান এবং বিশ্ব শান্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মাঝে সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়, যা বিশ্ব মিডিয়ার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
আরও পড়ুন: সাবেক এমপি হাবিবে মিল্লাত মুন্নার বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আলোকপাতকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চলমান ইউক্রেন সংঘাতকে একটি 'অন্তহীন ভয়াবহ যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করে অতি দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হওয়ার তীব্র আকুতি জানান। তিনি রুশ রাষ্ট্রপ্রধানকে জানান যে, আধুনিক বিশ্বে যেকোনো সংকটের সমাধান সামরিক শক্তির মাধ্যমে কাম্য হতে পারে না। মানবজাতির সুরক্ষার স্বার্থে সংঘাতের পথ পরিহার করে সংলাপের টেবিলে স্থায়ী সমাধানের অনুসন্ধান করাই একমাত্র সঠিক পথ। মোদি উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধের প্রতিটি দিন বিশ্ব মানবতাবোধকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পক্ষান্তরে, শান্তির অভিমুখে নেওয়া একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপও মানবজাতির জন্য নতুন আশা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
ভারত সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর এমন দূরদর্শী আহ্বানের জবাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন। নরেন্দ্র মোদির শান্তির প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন জানান যে, রাশিয়াও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত বন্ধের পথেই ধাবিত হচ্ছে। তবে নিজের দেশের সামরিক ও সীমান্ত নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ বজায় রেখেই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভারতের সাথে মস্কোর সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় থাকা এবং সরাসরি আলোচনার এই পথকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণনাশের হুমকি, ইসরায়েলে প্রত্যাবর্তন
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনের সীমানায় রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকা এই সংঘাতের কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রণক্ষেত্রে দুই পরাশক্তির আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বেসামরিক জীবনের জন্য চরম হুমকি তৈরি করেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কেবল অঞ্চলের সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র পৃথিবীর জ্বালানি সম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
শান্তির আলোচনার পাশাপাশি ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কৌশলগত হামলার বিষয়েও কঠোর হুশিয়ারি প্রদান করতে ছাড়েননি প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইউক্রেনীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে রাশিয়ার ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখা হলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। বিশেষ করে ইউক্রেনের অর্থনীতি ও জাতীয় সম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত হানার জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বিসকেকের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটিতে একদিকে যেমন যুদ্ধের তীব্রতা প্রশমনের আলোচনা দেখা গেছে, ঠিক তেমনই সামরিক কৌশলের কঠোর অবস্থানও পরিলক্ষিত হয়েছে।
এসসিও সম্মেলনের এই বিশেষ বৈঠক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে। ভারতের শান্তির রূপরেখা পেশ এবং রাশিয়ার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার আশা জাগাচ্ছে। বিসকেক মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম এই যুদ্ধ নিরসনে কতটুকু ভূমিকা রাখে, তা আগামী দিনগুলোতেই স্পষ্ট হবে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।